শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ নতুন নয়। তবে অস্ট্রেলিয়ার একটি উদ্যোগ দেখাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। মেলবোর্নের ‘অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর দ্য মুভিং ইমেজ’ (এসিএমআই) শিশুদের জন্য এমন চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করছে, যা শুধু বিনোদন নয়, বরং তাদের আবেগ, সহানুভূতি ও সামাজিক দক্ষতা গড়ে তুলতেও সহায়তা করছে। ‘কিডস ফ্লিকস উইথ ফিলিংস’ নামের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে শিশুদের মানসিক বিকাশে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মেলবোর্নের ফেডারেশন স্কয়ারে অবস্থিত এসিএমআই প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি দর্শনার্থীকে স্বাগত জানায়। প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ এই কর্মসূচিতে শিশুদের ভয়, আনন্দ, দুঃখ, উদ্বেগ কিংবা ভালোবাসার মতো অনুভূতিগুলো সহজভাবে বুঝতে শেখানো হয়। প্রতিটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পর শিশুদের একটি অ্যাকটিভিটি কিট দেওয়া হয়, যাতে তারা বাড়িতে ফিরে গল্পের চরিত্র, অনুভূতি এবং ঘটনাগুলো নিয়ে আরও ভাবতে পারে।
এসিএমআই-এর জ্যেষ্ঠ কিউরেটর রিস গুডউইনের মতে, একটি ভালো চলচ্চিত্র শিশুদের অন্যের অনুভূতি উপলব্ধি করতে শেখায়। যখন কোনো শিশু পর্দার চরিত্রের দুঃখ দেখে আবেগাপ্লুত হয়, তখন সে সহানুভূতির প্রথম পাঠ গ্রহণ করে। এই কর্মসূচিতে ‘ইটি দ্য এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল’, ‘ইনসাইড আউট ২’, ‘কোকো’ এবং ‘ল্যাবিরিন্থ’-এর মতো চলচ্চিত্র দেখানো হয়। এসব গল্পের মাধ্যমে শিশুরা বন্ধুত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ, ভয় জয় এবং নিজের আবেগ প্রকাশের গুরুত্ব বুঝতে শেখে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতাও এই উদ্যোগের ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছে। সিডনিভিত্তিক মনোবিজ্ঞানী ও নাট্যকার জন মার্টিন বলেন, ভালো চলচ্চিত্র শিশুদের ভাষা শেখানোর পাশাপাশি সম্পর্ক, অনুভূতি ও সংস্কৃতির গভীরতাও বুঝতে সাহায্য করে। অন্যদিকে প্রবাসী অভিভাবক তানভীর আহমেদ জানান, তাঁর সাত বছরের ছেলে ‘ইনসাইড আউট’ দেখার পর নিজের রাগ বা মন খারাপের কারণ সহজে প্রকাশ করতে শিখেছে। এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও খোলামেলা আলোচনা বেড়েছে।
গবেষকদের মতে, শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র অনেক সময় বইয়ের চেয়েও সহজভাবে আবেগ শেখার সুযোগ তৈরি করে। ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লুইস প্যাচ মনে করেন, দৃশ্য, শব্দ, সংগীত এবং চরিত্রের অভিনয় একসঙ্গে শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তবে শুধু সিনেমা দেখানোই যথেষ্ট নয়। অভিভাবকদের উচিত চলচ্চিত্র শেষে সন্তানকে প্রশ্ন করা—চরিত্রটি কেন কষ্ট পেল, কেন ভয় পেল কিংবা কীভাবে সমস্যার সমাধান করল। এতে শিশু নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতাও অর্জন করে।
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে শিশুদের স্ক্রিন টাইম পুরোপুরি বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। তাই সময়ের পরিমাণের পাশাপাশি তারা কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসম্মত ও শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র শিশুদের কল্পনাশক্তি, সহানুভূতি এবং মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার এসিএমআই-এর এই উদ্যোগ সেই বার্তাই আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।


























