অস্ট্রেলিয়ায় নতুন অর্থবছরের শুরুতে কর ও মজুরি কাঠামোয় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কার্যকর হতে যাচ্ছে। আগামী জুলাই মাস থেকে দেশটির শ্রমবাজার, কর্মচারীদের বেতন, অবসরভাতা এবং কর ব্যবস্থায় নতুন নিয়ম চালু হবে, যা লাখো কর্মজীবী মানুষের আয় ও ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। সরকার বলছে, এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ কমানো, কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করা।
প্রতি বছরের মতো এবারও ১ জুলাই থেকে অস্ট্রেলিয়ার নতুন অর্থবছর শুরু হবে। এ সময় বিভিন্ন আর্থিক নীতি, করহার এবং কর্মসংস্থানসংক্রান্ত বিধান সংশোধন করা হয়ে থাকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরকে সামনে রেখে ঘোষিত পরিবর্তনগুলো বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ এগুলো সরাসরি কর্মীদের হাতে পাওয়া আয় এবং নিয়োগকর্তাদের ব্যয়কে প্রভাবিত করবে।
অস্ট্রেলিয়ার কর কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই ধাপে ধাপে আয়ভিত্তিক কর আদায়ের ওপর নির্ভরশীল। নতুন অর্থবছরে কিছু করসীমা এবং করহার সমন্বয় করা হতে পারে, যার ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, করহার কমানো বা করসীমা বাড়ানোর ফলে মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকবে, যা ভোগব্যয় বৃদ্ধি করে অর্থনীতিকে চাঙা করতে সহায়তা করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিক চাপে রয়েছে। এই বাস্তবতায় করব্যবস্থার পরিবর্তন জনগণের জন্য কিছুটা স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে।
জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি। দেশটির শিল্প সম্পর্ক কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নিম্ন আয়ের কর্মীদের মজুরি বাড়ানো হবে। এর ফলে খুচরা ব্যবসা, আতিথেয়তা, পরিচ্ছন্নতা এবং সেবাখাতের লাখো কর্মী উপকৃত হবেন।
শ্রমিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছে যে, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানো জরুরি। অন্যদিকে ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে যে অতিরিক্ত মজুরি বৃদ্ধি ছোট ব্যবসার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবুও সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করছে, শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখতে মজুরি বৃদ্ধি প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ার অবসরভাতা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম উন্নত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। জুলাই থেকে নিয়োগকর্তাদের বাধ্যতামূলক সুপারঅ্যানুয়েশন অবদান আরও বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ কর্মীদের অবসরকালীন সঞ্চয়ের জন্য নিয়োগকর্তাদের আগের তুলনায় বেশি অর্থ জমা দিতে হবে।
এ পরিবর্তনের ফলে কর্মজীবনের শেষে কর্মীরা আরও বেশি সঞ্চয় নিয়ে অবসরে যেতে পারবেন। যদিও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করবে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কর ও মজুরি কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে অনেক কর্মীর হাতে মাস শেষে কিছু অতিরিক্ত অর্থ থাকবে। তবে এর পরিমাণ নির্ভর করবে ব্যক্তির আয়, পেশা এবং কর্মঘণ্টার ওপর। উচ্চ আয়ের কর্মীদের তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত এই অর্থ পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাসস্থান খাতে ব্যয় হতে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন নীতিমালার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলোকে বাড়তি মজুরি ও অবসরভাতা প্রদানে প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের বাজেট পুনর্বিন্যাস করছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, কর্মীদের হাতে বেশি অর্থ থাকলে ভোক্তা ব্যয়ও বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যবসার জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে ব্যয় বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ায় বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী ও শিক্ষার্থী কাজ করেন। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ এসব পরিবর্তনের আওতায় আসবেন। যারা খণ্ডকালীন বা পূর্ণকালীন কাজ করেন, তারা ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার প্রভাব সরাসরি অনুভব করবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদেশি কর্মীদের জন্য এই পরিবর্তন ইতিবাচক হতে পারে, কারণ এতে তাদের সঞ্চয় ও জীবনমান উন্নত হওয়ার সুযোগ বাড়বে।
মজুরি বৃদ্ধির একটি বড় প্রশ্ন হলো এটি মূল্যস্ফীতির ওপর কী প্রভাব ফেলবে। কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বেতন বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, যা পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। তবে অন্যরা যুক্তি দেন যে, নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত মজুরি বৃদ্ধি অর্থনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক।
অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। তাই নতুন পরিবর্তনগুলোর প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মজুরি বৃদ্ধি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে কর্মীদের উৎসাহ ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে, অন্যদিকে কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়োগ কমাতে পারে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান শ্রমবাজার তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। অনেক খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা এখনও বেশি। ফলে মজুরি বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব সীমিত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবাসন, জ্বালানি, খাদ্য এবং পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবার আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। সরকার মনে করছে, কর ও মজুরি কাঠামোর এই পরিবর্তন জনগণকে সেই চাপ মোকাবিলায় কিছুটা সহায়তা করবে।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য অতিরিক্ত আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক পরিবার তাদের সঞ্চয় পুনর্গঠন কিংবা ঋণের চাপ কমানোর সুযোগ পাবে।
অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি বর্তমানে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলা করছে। এই অবস্থায় কর্মীদের আয় বৃদ্ধি এবং কর কাঠামোর সংস্কার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সফল বাস্তবায়ন হলে নতুন নীতিগুলো কর্মসংস্থান, ভোক্তা ব্যয় এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের গতিশীলতার ওপর।
জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া কর, মজুরি এবং অবসরভাতা সংক্রান্ত পরিবর্তন অস্ট্রেলিয়ার লাখো কর্মজীবী মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হতে যাচ্ছে। কর্মীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ পৌঁছানো, অবসরকালীন সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলার লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যদিও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিছু অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হবে, তবুও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির গতি বাড়ানো এবং জনগণের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করাই এসব পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য।




























