নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে ফুটবল ইতিহাসের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের জন্ম হলো। টানটান উত্তেজনায় ভরা ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেসের দুর্দান্ত গোলে নিশ্চিত হয় লা রোহার শিরোপা।
ম্যাচ শেষে ট্রফি হাতে উদযাপনে মেতে ওঠে স্পেন, আর অন্য প্রান্তে চোখের জল লুকাতে পারেননি লিওনেল মেসি। নিজের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ হিসেবে যেটিকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সেই ম্যাচে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে যায় আর্জেন্টাইন মহাতারকার।
ফাইনাল শেষে আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় ফেরান তোরেস বলেন, “এই গোলটি আমি একা করিনি, এটি যেন স্পেনের চার কোটি ৭০ লাখ মানুষের গোল।”
স্পেনের বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস
এই শিরোপা শুধু বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দই এনে দেয়নি, বরং স্পেনকে ফুটবল ইতিহাসের নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
২০২৩ সালে নারী বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার পুরুষ বিশ্বকাপও জিতেছে স্পেন। ফলে ইতিহাসে প্রথম দেশ হিসেবে একই সময়ে পুরুষ ও নারী—দুই বিভাগের ফিফা বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়েছে ইউরোপের দেশটি।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, “এই খেলোয়াড়দের সঙ্গে এমন যাত্রার অংশ হতে পারা আমার জন্য গর্বের। তারা অসাধারণ একটি দল।”
মেসির স্বপ্নভঙ্গ, কান্নায় বিদায়
বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন লিওনেল মেসি। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্যও ছিল আর্জেন্টিনার সামনে। কিন্তু স্পেনের সংগঠিত ফুটবলের সামনে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
রানার্সআপ পদক গ্রহণের সময় গ্যালারিতে উপস্থিত আর্জেন্টাইন সমর্থকদের দিকে তাকিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি।
ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, “অবশ্যই কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমরা জানি, শেষ পর্যন্ত নিজেদের সর্বস্ব দিয়েই লড়েছি। এই দলকে নিয়ে আমি গর্বিত।”
স্কোরলাইন যতটা বলছে, ম্যাচ ছিল তার চেয়েও একপেশে
স্কোরবোর্ডে ব্যবধান ছিল মাত্র এক গোলের। কিন্তু পুরো ম্যাচে আধিপত্য ছিল স্পেনের।
ম্যাচের প্রথম ২০টি শটই নেয় স্পেন। আর্জেন্টিনা প্রথম কার্যকর আক্রমণ করতে পারে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় ভাগে। কর্নারেও ছিল স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য। ম্যাচের প্রথম ১০টি কর্নারের মধ্যে ৯টিই পায় তারা।
আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ না করলে ম্যাচটি আরও বড় ব্যবধানে শেষ হতে পারত। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২টি সেভ করে দলকে শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে রাখেন তিনি।
স্পেনের কোচ বলেন, “দিবু আজ অসাধারণ খেলেছে। ও না থাকলে ম্যাচের ফল আরও আগেই নির্ধারিত হয়ে যেত।”
শেষ মুহূর্তেও ফিরতে পারেনি আর্জেন্টিনা
ম্যাচের শেষ দিকে একবার সমতায় ফেরার সুযোগ পেয়েছিল আর্জেন্টিনা।
শেষ বাঁশি বাজার কয়েক মিনিট আগে মেসির নেওয়া কর্নার থেকে বল পৌঁছে যায় বদলি খেলোয়াড় জুলিয়ানো সিমিওনের সামনে। কিন্তু তাঁর শট ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়।
ফেরান তোরেস বলেন, “যখন প্রতিপক্ষে মেসির মতো একজন খেলোয়াড় থাকেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই চাপ থাকে। কিন্তু আমরা জানতাম, নিজেদের ফুটবল খেলতে পারলে সফল হব। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে।”
লাল কার্ডে আর্জেন্টিনার বিপদ আরও বাড়ে
নির্ধারিত সময়ের যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ।
স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবার্সির ওপর বিপজ্জনক ট্যাকলের কারণে রেফারি সঙ্গে সঙ্গেই দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান। ফলে ম্যাচের শেষ অংশে ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের।
রক্ষণই এনে দিল বিশ্বকাপ
পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের রক্ষণভাগ।
আট ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে তারা, যা বিশ্বকাপজয়ী কোনো দলের ইতিহাসে সবচেয়ে কম গোল হজমের নতুন রেকর্ড।
বল নিজেদের দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে সুযোগ না দেওয়ার কৌশল পুরো টুর্নামেন্টেই নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। ফাইনালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, “আমরা শেষ পর্যন্ত লড়েছি। কিন্তু সত্যি বলতে, আজ স্পেনই ছিল ভালো দল।”
মেসির শেষ বিশ্বকাপ?
৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এটিই হতে পারে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ।
ম্যাচ শেষে আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমরা জিততে চেয়েছিলাম। সেটা হয়নি। তবে আমি শুধু একটি কথাই বলতে চাই—ধন্যবাদ। আমাদের সমর্থক, সতীর্থ এবং পুরো দেশের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।”
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ইতোমধ্যেই কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা, অসংখ্য ব্যক্তিগত পুরস্কার—সব মিলিয়ে তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
স্মরণীয় এক বিশ্বকাপ ফাইনাল
ফুটবলের পাশাপাশি এবারের ফাইনাল ছিল বিনোদনেরও এক মহাযজ্ঞ।
ফিফার ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে আয়োজন করা হয় হাফটাইম শো। গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাড পিট, টম ক্রুজ, ম্যাট ডেমন, ড্যানিয়েল ক্রেগ, স্টিফেন কারি, কেভিন ডুরান্ট, সেরেনা উইলিয়ামস, কার্লোস আলকারাজ, ডেভিড বেকহ্যাম, জিনেদিন জিদানসহ বিশ্ববিখ্যাত অসংখ্য তারকা।
প্রায় ৮০ হাজার দর্শক মাঠে উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমে ম্যাচটি উপভোগ করেছেন।
সবশেষে ইতিহাস লিখেছে স্পেন। ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলে নিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, আধুনিক ফুটবলে ধারাবাহিকতা, শৃঙ্খলা এবং দলগত শক্তির কোনো বিকল্প নেই।




























