স্বর্ণের দামে বড় পতন, ঈদের পর ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির খবর
স্বর্ণের দামে বড় পতন ঘটেছে দেশের বাজারে। ঈদুল আজহার পর দ্বিতীয়বারের মতো স্বর্ণের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৪৮২ টাকা কমানো হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের উচ্চমূল্যের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ক্রেতাদের মধ্যে।
শনিবার সকালে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় নতুন করে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। সংগঠনটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন মূল্যতালিকা শনিবার সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ৩৭৩ টাকা। এটি বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয় মানের স্বর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এই শ্রেণির স্বর্ণের দাম কমায় সাধারণ ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৯৩৩ টাকা। একইভাবে ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৪ টাকা। অন্যদিকে সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হবে ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৫৭ টাকায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কাঁচা স্বর্ণের দামের ওঠানামাও দেশের স্বর্ণ বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য পরিবর্তন হলে তার প্রতিফলন দ্রুতই খুচরা বাজারে দেখা যায়।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এর ফলে বাজার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ক্রেতারাও কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে গত ২ জুনও স্বর্ণের দাম কমিয়েছিল বাজুস। সেদিন প্রতি ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমানো হয়েছিল। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও দাম কমানোর ফলে বাজারে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সামনের দিনগুলোতে স্বর্ণের দামে আরও পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে স্বর্ণের বাজার বরাবরই অত্যন্ত সংবেদনশীল। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রার বিনিময় হার এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণের ওপর স্বর্ণের দাম অনেকাংশে নির্ভর করে। ফলে বর্তমান মূল্য হ্রাস স্থায়ী হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
চলতি বছরে স্বর্ণের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ৭১ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ বার দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং ৩৪ বার দাম কমানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে স্বর্ণের বাজারে স্থিতিশীলতা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
অন্যদিকে গত ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। ওই বছর ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয় এবং ২৯ বার কমানো হয়। ফলে বিগত বছরগুলোতেও স্বর্ণের বাজারে ব্যাপক ওঠানামা ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিলে অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আবার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে স্বর্ণের চাহিদা কিছুটা কমে যায়, যা দামের ওপর প্রভাব ফেলে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের পর সাধারণত বাজারে কেনাবেচার গতি কিছুটা কমে যায়। এই সময়ে দাম কমলে অনেক ক্রেতা নতুন করে স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করেন। বিশেষ করে বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণ কেনার আগ্রহ বাড়তে পারে।
এদিকে ক্রেতাদের একাংশ মনে করছেন, সাম্প্রতিক মূল্য হ্রাস স্বর্ণ কেনার জন্য একটি ভালো সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ভবিষ্যতে দাম আরও কমতে পারে কি না, সেটিও অনেকের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বর্ণের দামে বড় পতনের ফলে দেশের অলংকার বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘদিন উচ্চমূল্যের কারণে অনেক ক্রেতা স্বর্ণ কেনা থেকে বিরত ছিলেন। নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর বিক্রি কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
সব মিলিয়ে ঈদের পর স্বর্ণের দামে বড় পতন দেশের বাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভরিতে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা কমার ফলে স্বর্ণ ক্রয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য এটি স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন বাজার পর্যবেক্ষকদের নজর থাকবে আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণের দাম কোন দিকে যায় এবং বাজুস আবারও নতুন কোনো সমন্বয়ের ঘোষণা দেয় কি না।





























