বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, বন সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা-২০২৬ এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের পরিবেশ রক্ষায় এটি সরকারের অন্যতম বৃহৎ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ থেকেও পাঠ করা হয়, যা ধর্মীয় সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। পরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও সাফল্য নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫, বন্য প্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৬ এবং বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫ বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। পাশাপাশি সামাজিক বনায়নের উপকারভোগীদের মধ্যে লভ্যাংশের চেক বিতরণ করেন। এই উদ্যোগকে পরিবেশ সংরক্ষণে জনগণের অংশগ্রহণের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. সাইমুম পারভেজ এবং প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তাঁরা পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে জলপাই, জারুল ও নিমগাছের চারা রোপণ করেন। পরে তিনি পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে আয়োজিত জাতীয় বৃক্ষমেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা প্রদর্শন করা হয়।
এবারের জাতীয় বৃক্ষমেলায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১২০টি স্টল অংশ নিয়েছে। দর্শনার্থীরা বিভিন্ন ধরনের গাছের চারা সংগ্রহের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সচেতনতা সম্পর্কিত তথ্যও জানতে পারছেন। মেলায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী উদ্যোগও প্রদর্শন করা হচ্ছে।
শুধু রাজধানীতেই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এই কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সাতটি বিভাগীয় শহরে ১৫ দিনব্যাপী, ৫৬টি জেলা সদরে সাত দিনব্যাপী এবং ২৯টি উপজেলায় তিন দিনব্যাপী বৃক্ষমেলার আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সারাদেশে সবুজায়নের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
সরকার জানিয়েছে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। সেলটি প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে।
এই মহাপরিকল্পনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, ন্যাশনাল ট্রি ডেটাবেজ এবং ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটালভাবে বনায়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। ফলে কোথায় কতটি গাছ রোপণ হয়েছে এবং সেগুলোর বর্তমান অবস্থা সহজেই জানা সম্ভব হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন লাখ নতুন সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। বনভূমি বৃদ্ধি পেলে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ বাড়বে, বায়ুদূষণ কমবে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সহজ হবে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতিও অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৭৯ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের প্রথম জাতীয় বননীতি প্রণয়ন করেন এবং বৃক্ষরোপণকে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দেন। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতীয় বৃক্ষমেলার সূচনা করেন এবং সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বর্তমান সরকার সেই ধারাবাহিকতাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু গাছ লাগানো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করে দেশের বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি করা। এতে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে গত ১৩ জুন কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট সংরক্ষিত বনে একটি গর্জনগাছের চারা রোপণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশব্যাপী ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন। সেই কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে এই বৃহৎ আয়োজন বাস্তবায়ন করা হলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন একযোগে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে অংশ নিলে এই উদ্যোগ আরও সফল হবে। প্রতিটি নাগরিক বছরে অন্তত একটি গাছ রোপণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব নিলে বাংলাদেশ আরও সবুজ, পরিবেশবান্ধব এবং জলবায়ু সহনশীল দেশে পরিণত হতে পারে।




























