বিশ্বকাপে জনবহুল দেশ বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশগুলোর বেশিরভাগই এবারও বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি। জনসংখ্যা বেশি হলেও কেন এসব দেশ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে নিয়মিত অংশ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে বিবিসি।
২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ১০টি দেশের মধ্যে মাত্র দুটি দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল, বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া এবং আরও কয়েকটি জনবহুল দেশ এখনও বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা বেশি হওয়া মানেই বিশ্বমানের ফুটবল দল গড়ে তোলা নয়। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ এবং Soccernomics-এর সহলেখক স্টেফান শিমানস্কির মতে, সফল ফুটবল জাতি হতে হলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রয়োজন।
বিশ্বকাপে সফল হতে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
- শক্তিশালী অর্থনীতি ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ।
- আধুনিক ফুটবল অবকাঠামো।
- দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ফুটবল অভিজ্ঞতা।
- দক্ষ কোচিং ও বয়সভিত্তিক একাডেমি।
- নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
- দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দক্ষ ফুটবল প্রশাসন।
শিমানস্কির মতে, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মাথাপিছু আয় উন্নত দেশের তুলনায় কম হলেও শত বছরের ফুটবল ঐতিহ্য তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি। একইভাবে মাত্র ৩৫ লাখ জনসংখ্যার উরুগুয়ে দুটি বিশ্বকাপ জিতেছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও শক্তিশালী ফুটবল সংস্কৃতির কারণে।
কেন পিছিয়ে দক্ষিণ এশিয়া?
বিশ্বকাপে জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এখনও মূল পর্বে খেলতে পারেনি। ভারতের সাবেক ফুটবলার শ্যাম থাপার মতে, ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা ফুটবলের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্লেষক অদিতে করিম মনে করেন, মূল সমস্যা ক্রিকেট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও শক্তিশালী ফুটবল কাঠামোর অভাব। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটে সফল হয়েও ফুটবলে উন্নতি করেছে, যা এশিয়ার দেশগুলোর জন্য উদাহরণ হতে পারে।
চীনের ব্যর্থতা
চীন কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেও ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপে উঠতে পারেনি। ফুটবল বিশ্লেষক মার্ক ড্রায়ারের মতে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং পেশাদার পরিকল্পনার অভাব দেশটির সবচেয়ে বড় সমস্যা।
ইন্দোনেশিয়ার ভিন্ন পথ
ইন্দোনেশিয়া ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভালো পারফরম্যান্স করলেও তাদের সাফল্যের বড় অংশ এসেছে ইউরোপে বেড়ে ওঠা ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের দলে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে। স্থানীয় ফুটবল উন্নয়ন এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
ইথিওপিয়ার সংকট
ইথিওপিয়ার ফুটবলে সবচেয়ে বড় সমস্যা অবকাঠামো। পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম না থাকায় স্থানীয় লিগ পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি মৌসুমে মাত্র তিনটি অনুমোদিত মাঠ ব্যবহার করে শত শত ম্যাচ আয়োজন করতে হয়েছে।
পাকিস্তানের সমস্যা
পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ফিফা কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞা দেয়। ফলে ফুটবল উন্নয়ন কার্যক্রমও বড় ধাক্কা খায়।
ব্যতিক্রমী সাফল্যের উদাহরণ
সব দেশ যে ব্যর্থ হয়েছে, তা নয়।
- মরক্কো ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছে।
- দক্ষিণ কোরিয়া ২০০২ বিশ্বকাপে শেষ চারে খেলেছে।
- জাপান ধারাবাহিকভাবে বিশ্বকাপে ভালো পারফরম্যান্স করছে।
- এসব দেশের সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক একাডেমি এবং শক্তিশালী লিগ ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ফুটবল এগিয়ে নিতে প্রয়োজন—
- বয়সভিত্তিক একাডেমি সম্প্রসারণ।
- জেলা পর্যায়ে ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়ন।
- পেশাদার লিগের মান বৃদ্ধি।
- দক্ষ কোচ তৈরি।
- দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
- রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ফুটবল প্রশাসন।
বিশ্বকাপে জনবহুল দেশ নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় পরিষ্কার, শুধু জনসংখ্যা বড় হলেই বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ প্রশাসন, আধুনিক অবকাঠামো এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি এই খাতগুলোতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।




























