২১ বছর আগের এক স্মৃতিময় অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তির আবহে আজ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মিশরের মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা। এই প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই ২০০৫ সালে প্রথমবার আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন লিওনেল মেসি। সেই ম্যাচেই করেছিলেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল, যা পরবর্তীতে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্যারিয়ারের সূচনালগ্ন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসির পথচলা শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ দিয়ে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর উত্থানের প্রকৃত গল্পটি লেখা শুরু হয় ২০০৫ সালের ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে। মিশরের বিপক্ষে সেই ম্যাচটি ছিল আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে তাঁর প্রথম একাদশে খেলা ম্যাচ, যা পরবর্তীতে বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব পায়।
সেই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার শুরুটা ছিল হতাশাজনক। প্রথম ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১-০ গোলে হেরে বসেছিল দলটি। তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মার্কিন প্রতিভা ফ্রেডি আডু। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হওয়া এই তারকাকে অনেকেই ভবিষ্যতের ‘নতুন পেলে’ হিসেবে দেখছিলেন। অন্যদিকে মেসি তখনও ছিলেন সম্ভাবনাময় এক তরুণ ফুটবলার।
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচে মেসি দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামলেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেননি। ফলে দ্বিতীয় ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে তাঁকে শুরুর একাদশে সুযোগ দেওয়া হয়। সেই আস্থার প্রতিদান দিতে খুব বেশি সময় নেননি তিনি। ম্যাচের ৪৭তম মিনিটে হুলিও বারোশোর ক্রস থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন মেসি।
মেসির সেই গোল আর্জেন্টিনার জন্য শুধু একটি লিডই এনে দেয়নি, বরং টুর্নামেন্টে ঘুরে দাঁড়ানোর পথও খুলে দেয়। ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে জয় পায়। দলের অন্য গোলটি করেছিলেন পাবলো জাবালেতা। শেষ বাঁশি বাজার পাঁচ মিনিট আগে মেসিকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং তাঁর জায়গায় নামেন লুকাস বিগলিয়া।
মিশরের বিপক্ষে সেই প্রথম গোলের পর মেসির আত্মবিশ্বাস ও পারফরম্যান্স দুটোই নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলোতে তিনি ধারাবাহিকভাবে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাতে থাকেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে গোল করা, আক্রমণ তৈরি করা এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দক্ষতায় তিনি দ্রুতই টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হন।
টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার আগেই বিশ্ব ফুটবল বুঝতে শুরু করেছিল, একটি নতুন অধ্যায়ের জন্ম হচ্ছে। আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেসি। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে দুটি গোল করেন তিনি। সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষেও গোল করে দলের জয়ে বড় অবদান রাখেন।
শেষ পর্যন্ত ৬ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন মেসি এবং জিতে নেন গোল্ডেন বুট। পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বলও নিজের করে নেন। আর্জেন্টিনার হয়ে শিরোপা জয়ের সেই যাত্রাই ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম বড় সাফল্য এবং ভবিষ্যতের অসংখ্য অর্জনের ভিত্তি।
আজ, দুই দশকেরও বেশি সময় পর আবার যখন মিশরের মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা, তখন সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো নতুন করে ফিরে আসছে। যে প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ গোল করে মেসি নিজের মহাকাব্যের সূচনা করেছিলেন, সেই মিশরই আবার আর্জেন্টিনার সামনে দাঁড়িয়ে। ইতিহাস অবশ্য পুনরাবৃত্তি হয় কি না, সেটার উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়ে।























