বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছে আর্জেন্টিনা। কোচ লিওনেল স্কালোনি খুব বেশি চমক না দেখিয়ে অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতার ওপর ভরসা রেখেছেন। লিওনেল মেসিকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় দলের সাফল্যের মূল কারিগরদের বেশির ভাগই।
কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের পর আর্জেন্টিনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। সৌভাগ্যবশত, সে সময়ের দলটির গড় বয়স তুলনামূলক কম হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে একই কাঠামো নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন স্কালোনি। এবারও সেই পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখা গেছে ঘোষিত স্কোয়াডে।
দল ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মার্কোস আকুনার নাম। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেও এবার তিনি জায়গা পাননি। রিভার প্লেটে নিয়মিত খেলার সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর বাদ পড়া কিছুটা অনুমিতই ছিল। তবুও বিশ্বকাপের মতো আসরে তাঁর অভিজ্ঞতা দলকে সাহায্য করতে পারত বলে মনে করছেন অনেকে।
আকুনার অনুপস্থিতি আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে একটি প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ স্কোয়াডে আর কোনো স্বীকৃত লেফটব্যাক নেই। প্রয়োজন হলে ফাকুন্দো মেদিনা কিংবা ভ্যালেন্তিন বার্কো এই পজিশনে খেলতে পারেন। তবে তাঁদের কেউই বর্তমানে নিয়মিতভাবে এই ভূমিকায় খেলছেন না।
ভ্যালেন্তিন বার্কো সাম্প্রতিক সময়ে মূলত মিডফিল্ডে খেলছেন। যদিও ক্যারিয়ারের শুরুতে লেফটব্যাক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁকে ওই অবস্থানে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও এটি আর্জেন্টিনার প্রথম পছন্দের সমাধান নয়।
রক্ষণভাগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো মার্কোস সেনেসির পরিবর্তে ফাকুন্দো মেদিনাকে দলে নেওয়া। সেনেসি সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলের পরিকল্পনায় ছিলেন এবং বেশ কয়েকটি ম্যাচেও সুযোগ পেয়েছেন। তারপরও শেষ পর্যন্ত স্কালোনি মেদিনার প্রতি আস্থা রেখেছেন।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে কৌশলগত কারণও থাকতে পারে। মেদিনা একাধিক পজিশনে খেলতে সক্ষম। সেন্টারব্যাকের পাশাপাশি প্রয়োজনে লেফটব্যাক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারেন। বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ টুর্নামেন্টে এমন বহুমুখী খেলোয়াড় কোচদের কাছে বাড়তি সুবিধা এনে দেয়।
অভিজ্ঞ লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে স্কোয়াডে রাখার বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। চোটের কারণে কিছু সময় মাঠের বাইরে থাকলেও তাঁর নেতৃত্বগুণ এবং বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে বাড়তি শক্তি দেয়। বাঁ পায়ের সেন্টারব্যাক হিসেবে তিনি এখনও দলের অন্যতম ভরসা।
গোলরক্ষক বিভাগে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজই থাকছেন দলের প্রথম পছন্দ হিসেবে। বড় ম্যাচে তাঁর মানসিক দৃঢ়তা এবং চাপ সামলানোর ক্ষমতা আর্জেন্টিনার জন্য বড় সম্পদ।
মিডফিল্ডে স্কালোনি আবারও আস্থা রেখেছেন জিওভানি লো সেলসোর ওপর। ২০২২ বিশ্বকাপের আগে চোটের কারণে তিনি টুর্নামেন্ট মিস করেছিলেন। এবার সুস্থ অবস্থায় বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এই মিডফিল্ডার।
লো সেলসোর অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে স্কালোনি এখনও তাঁর সৃজনশীলতাকে অত্যন্ত মূল্য দেন। মাঝমাঠে আক্রমণ ও রক্ষণকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশেষ করে কঠিন ম্যাচগুলোতে তাঁর পাসিং এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দলের জন্য কার্যকর হবে।
তবে লো সেলসোকে জায়গা দিতে গিয়ে কয়েকজন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়কে বাদ পড়তে হয়েছে। এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়া কিংবা ম্যাক্সিমো পেরোনের মতো ফুটবলাররা শেষ পর্যন্ত স্কোয়াডে সুযোগ পাননি। তাঁদের বাদ পড়া কিছু সমর্থকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও কোচ অভিজ্ঞতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
মিডফিল্ডের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় লিয়ান্দ্রো পারাদেস ও অ্যালেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের ওপর বিশেষ ভরসা রাখছেন স্কালোনি। দুজনই সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য পারফরমার। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এনজো ফার্নান্দেজও আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে বড় শক্তি। তাঁর পরিশ্রম, পাসিং এবং আক্রমণে অবদান দলকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি আবারও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে চাইবেন।
আক্রমণভাগে স্কালোনির পরিকল্পনা বেশ পরিষ্কার। লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আক্রমণে রাখা হয়েছে একাধিক বিকল্প। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে কোচের হাতে।
হোসে ম্যানুয়েল লোপেজের অন্তর্ভুক্তি আক্রমণভাগের অন্যতম আলোচিত বিষয়। ক্লাব পর্যায়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে তিনি বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছেন। স্কালোনি তাঁর সাম্প্রতিক ফর্মকে গুরুত্ব দিয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
লোপেজকে মূলত তৃতীয় পছন্দের সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বিশ্বকাপের দীর্ঘ যাত্রায় বেঞ্চের খেলোয়াড়দের গুরুত্ব অনেক। সুযোগ পেলে তিনিও বড় অবদান রাখতে পারেন।
মেসির পাশাপাশি হুলিয়ান আলভারেজ এবং লাউতারো মার্তিনেজ আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা। দুজনই গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছেন। গোল করার পাশাপাশি দলীয় খেলায়ও তাঁদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
তুলনামূলকভাবে অনেক দলের চেয়ে আর্জেন্টিনা এবার বেশি সংখ্যক ফরোয়ার্ড দলে রেখেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে স্কালোনি আক্রমণাত্মক বিকল্পগুলো খোলা রাখতে চাইছেন। বিভিন্ন ধরনের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এটি সহায়ক হবে।
তবে দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তারকাদের উপস্থিতি নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা। এই স্কোয়াডের বেশির ভাগ খেলোয়াড় একে অপরের খেলার ধরন সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। ফলে মাঠে সমন্বয় গড়ে তুলতে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হবে না।
বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় অভিজ্ঞতা, ধারাবাহিকতা এবং দলীয় বোঝাপড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় আর্জেন্টিনার স্কোয়াড যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ বলেই মনে হচ্ছে। যদিও কিছু পজিশনে বিকল্পের ঘাটতি রয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে দলটি শক্তিশালী।
শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। স্কালোনির এই স্কোয়াডে ঝুঁকি কম, পরিচিত মুখ বেশি। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বকাপের মঞ্চে এই আস্থা কতটা সফলভাবে বাস্তব রূপ পায় এবং মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা আবারও ইতিহাস গড়তে পারে কি না।






















