ছোট ছোট রসালো আঙুর শুধু সুস্বাদুই নয়, এতে রয়েছে পানি, ফাইবার, ভিটামিন, খনিজ ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। সালাদে, ওটসে বা নাশতা হিসেবে সহজেই খাওয়া যায় এই ফল।
আঙুরে থাকা রেসভেরাট্রল, পলিফেনল ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ যৌগের সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। তবে আঙুর কোনো রোগের চিকিৎসা নয়। নিয়মিত সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে খেলে এর পুষ্টিগুণ থেকে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
১. ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে
এক কাপ আঙুরে প্রায় ১২৪ ক্যালরি থাকে। ফলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এটি তুলনামূলক কম ক্যালরির একটি ফলের নাশতা হতে পারে।
আঙুরে থাকা ফাইবার পেট ভরা অনুভূতি ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং খাবার থেকে গ্লুকোজ শোষণের গতি ধীর করতে পারে। তবে রক্তে শর্করার ওঠানামা কমাতে আঙুরের সঙ্গে বাদাম বা পনিরের মতো প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস খাওয়া যেতে পারে।
২. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে
আঙুরের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স মাঝারি মাত্রার। এতে থাকা ফাইবারও শরীরে চিনি শোষণের গতি ধীর করতে সাহায্য করতে পারে।
আঙুরে রেসভেরাট্রল নামের একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। কিছু গবেষণায় এই যৌগের সঙ্গে ইনসুলিন সংবেদনশীলতার সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু আঙুরের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
৩. হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যে উপকারী হতে পারে
আঙুরে থাকা রেসভেরাট্রলের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এই যৌগ রক্তনালির স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু উপকারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
তবে হৃদরোগ প্রতিরোধে আঙুরের নির্দিষ্ট ভূমিকা নিশ্চিত করতে আরও মানবগবেষণা প্রয়োজন।
৪. শরীর হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে
আঙুরে পানির পরিমাণ অনেক বেশি। এক কাপ আঙুরে প্রায় ১২১ গ্রাম পানি থাকতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখা, জয়েন্টে লুব্রিকেশন এবং শরীর থেকে বর্জ্য বের করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহায়তা করে।
৫. অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ
আঙুরে রেসভেরাট্রল, ফ্ল্যাভোনয়েড ও অন্যান্য পলিফেনলের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এগুলো শরীরে অতিরিক্ত ফ্রি র্যাডিক্যালের কারণে তৈরি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু গবেষণায় এসব যৌগের সম্ভাব্য ক্যানসারবিরোধী বৈশিষ্ট্যও দেখা হয়েছে। তবে আঙুর ক্যানসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করে এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
৬. বয়সজনিত পরিবর্তন ধীর করতে পারে
রেসভেরাট্রল নিয়ে অ্যান্টি-এজিং বা বয়সজনিত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় এই যৌগের সঙ্গে বিপাকক্রিয়া ও প্রদাহের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব পাওয়া গেছে।
তবে এ ধরনের গবেষণার বড় অংশ প্রাণীর ওপর পরিচালিত হয়েছে। মানুষের বয়সজনিত পরিবর্তনে আঙুর বা রেসভেরাট্রলের প্রভাব বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
৭. স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে
আঙুরে থাকা পলিফেনল ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিছু গবেষণায় আঙুরজাত উপাদান গ্রহণের পর মনোযোগ ও স্মৃতির কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি দেখা গেছে।
তবে এসব গবেষণার ফলাফলকে সাধারণভাবে পুরো আঙুর খাওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করার আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
৮. ঘুমের জন্য উপকারী হতে পারে
আঙুরে অল্প পরিমাণে মেলাটোনিন পাওয়া যায়। মেলাটোনিন শরীরের ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
তবে শুধু আঙুর খেলে ঘুমের সমস্যা দূর হবে এমন প্রমাণ নেই। পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।
৯. চোখের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে
আঙুরে লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিনের মতো উদ্ভিজ্জ রঞ্জক রয়েছে। এসব যৌগ চোখের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং আলো ও দৃষ্টির বৈপরীত্য সামলাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এগুলো বয়সজনিত ম্যাকুলার অবক্ষয় ও ছানি নিয়ে গবেষণার বিষয়ও হয়েছে।
১০. বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে
কালো ও বেগুনি আঙুরের রঙের জন্য দায়ী কোয়ারসেটিনসহ বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
আঙুরে থাকা পলিফেনল অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্যও সহায়ক হতে পারে। তবে এসব প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
১১. হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে
আঙুরে ভিটামিন কে, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো পুষ্টি রয়েছে। এসব পুষ্টি হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও স্বাস্থ্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু আঙুর খেয়ে হাড়ের প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি পাওয়া সম্ভব নয়। খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার রাখা জরুরি।
১২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় সহায়তা করতে পারে
এক কাপ আঙুরে প্রায় ৪.৮ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়া যায়। ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আঙুরের বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ রঞ্জক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেরও জীবাণুর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
এক কাপ আঙুরে কী কী পুষ্টি থাকে
এক কাপ বা প্রায় ১৫১ গ্রাম আঙুরে আনুমানিক পাওয়া যায়:
- ক্যালরি: ১২৪
- চর্বি: ০.২ গ্রাম
- সোডিয়াম: ৩ মিলিগ্রাম
- কার্বোহাইড্রেট: ২৯ গ্রাম
- ফাইবার: ১.৪ গ্রাম
- প্রোটিন: ১.১ গ্রাম
- যোগ করা চিনি: ০ গ্রাম
আঙুর খাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
আঙুরে অ্যালার্জি খুব সাধারণ নয়, তবে যেকোনো খাবারের মতো এটিও কারও কারও অ্যালার্জির কারণ হতে পারে।
একসঙ্গে অনেক বেশি আঙুর খেলে এতে থাকা ফাইবারের কারণে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা পেটব্যথার মতো হজমের সমস্যা হতে পারে।
এ ছাড়া ছোট শিশু এবং গিলতে সমস্যা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের জন্য পুরো আঙুর গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে আঙুর লম্বালম্বি করে ছোট টুকরো করে দেওয়া নিরাপদ।
খাদ্যতালিকায় আঙুর যোগ করার সহজ উপায়
আঙুর শুধু সরাসরি খাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে এটি যোগ করা যায়।
- ওটমিল বা ওভারনাইট ওটসে কেটে মিশিয়ে নিতে পারেন
- সালাদে যোগ করতে পারেন
- পনির বা বাদামের সঙ্গে নাশতা হিসেবে খেতে পারেন
- ব্রাসেলস স্প্রাউট, ব্রকলি বা মিষ্টি আলুর সঙ্গে রোস্ট করতে পারেন
- টার্ট বা পাইয়ের মতো ডেজার্টে ব্যবহার করতে পারেন
- আঙুর দিয়ে সালসা বা চাটনি তৈরি করতে পারেন
- ঠান্ডা বা রান্না করা হোল গ্রেইনের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে পারেন
আঙুর কেনার সময় টসটসে ও সতেজ ফল বেছে নিন। খাওয়ার বা রান্নার ঠিক আগে পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। ফ্রিজে রাখলে আঙুর তুলনামূলক বেশি সময় সতেজ থাকে।


























