দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে এই মৃত্যুর কথা জানানো হয়। একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে কারও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। সেপ্টেম্বর মাসে এখন পর্যন্ত একদিনে হামের উপসর্গ নিয়ে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা।
নতুন আট মৃত্যুর ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০ জনে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯৩০ শিশু এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের। সর্বশেষ আট মৃত্যুর মধ্যে চারটিই হয়েছে ঢাকা বিভাগে। টানা প্রাণহানির ঘটনায় শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ২৩২ জন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ হিসাবে সন্দেহজনক হাম রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৭২০ জনে। একই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১২৪ জনে। ফলে সংক্রমণ এখনও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় থাকার বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যেই স্পষ্ট হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ১ লাখ ৫২ হাজার ১১৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ জন। তবে নতুন রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি হওয়ায় অভিভাবকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সেপ্টেম্বরের আগের কয়েক দিনের তথ্যেও হামের কারণে ধারাবাহিক মৃত্যুর চিত্র দেখা গেছে। ১০ সেপ্টেম্বর একদিনে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছিল এবং মোট মৃত্যু তখন ১ হাজার ৯ জনে পৌঁছায়। ১২ সেপ্টেম্বরও আরও সাতজনের মৃত্যুর খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আর ১৩ সেপ্টেম্বর তিন শিশুর মৃত্যুর পর মোট প্রাণহানি দাঁড়ায় ১ হাজার ২২ জনে। সেই হিসাবে ১৪ সেপ্টেম্বরের আট মৃত্যু চলতি মাসে এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই বাংলাদেশের চলমান হাম পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকির বলে মূল্যায়ন করেছে। সংস্থাটি বলেছে, টিকাদানের ঘাটতি, পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা না থাকা এবং বিপুলসংখ্যক সংবেদনশীল শিশুর কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ এবং নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী, অপুষ্টিতে ভোগা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন শিশুদের ঝুঁকি বেশি।
চলমান পরিস্থিতির মধ্যে সরকার আবারও দেশব্যাপী হাম টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশব্যাপী হাম টিকাদান কার্যক্রম আবার শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় টিকার বড় অংশ ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে এবং বাকি টিকা ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আসার কথা রয়েছে। এর আগে জরুরি ও মপ-আপ কর্মসূচির আওতায় বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হাম প্রতিরোধে শিশুদের নির্ধারিত দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কারও জ্বরের সঙ্গে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কাশি, সর্দি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখাও সংক্রমণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। চলমান প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সময়মতো টিকা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাই প্রাণহানি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।



























