বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই হাড়ের খনিজ ঘনত্ব কমতে শুরু করে। বিশেষ করে মেনোপজের পর নারীদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলে ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই হাড়ের স্বাস্থ্য ধরে রাখতে শুধু ব্যায়াম নয়, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকাতেও নজর দেওয়া জরুরি। ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন কে ও প্রোটিনের মতো পুষ্টি হাড়ের গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১. প্রুন বা শুকনো বরই
হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রুন বা শুকনো বরই একটি সম্ভাবনাময় খাবার। কিছু গবেষণায় বিশেষ করে মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের হাড়ের খনিজ ঘনত্ব ধরে রাখার সঙ্গে প্রুন খাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
প্রুনে ভিটামিন কে থাকে, যা হাড় গঠনের প্রক্রিয়ায় ক্যালসিয়াম ব্যবহারে শরীরকে সহায়তা করে। এতে পলিফেনল নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে, যা শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
২. সার্ডিন মাছ
ক্যালসিয়াম শুধু দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার থেকেই পাওয়া যায় না। হাড়সহ খাওয়া যায় এমন সার্ডিন মাছও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। একটি ক্যান সার্ডিনে দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়ামের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাওয়া যেতে পারে।
এতে ভিটামিন ডিও রয়েছে, যা খাবার থেকে পাওয়া ক্যালসিয়াম শরীরে শোষণে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সার্ডিনে প্রোটিনও থাকে, যা হাড়ের পাশাপাশি পেশির স্বাস্থ্য ধরে রাখতে সহায়তা করে।
৩. হাড়সহ ক্যানড স্যামন
সার্ডিনের মতো হাড়সহ ক্যানড স্যামনেও ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও প্রোটিন পাওয়া যায়। তিন আউন্স বা প্রায় ৮৫ গ্রাম হাড়সহ ক্যানড স্যামনে দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়ামের একটি অংশ এবং ভিটামিন ডির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ থাকতে পারে।
স্যামন ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডেরও ভালো উৎস। হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপর ওমেগা-৩-এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে এবং এ বিষয়ে আরও প্রমাণ প্রয়োজন।
৪. টোফু
যারা খাদ্যতালিকায় উদ্ভিজ্জ খাবারের পরিমাণ বাড়াতে চান, তাদের জন্য টোফু একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে টোফুর সব ধরনের পণ্যে সমান পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে না।
ক্যালসিয়াম সালফেট দিয়ে তৈরি কিছু টোফুতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। টোফুতে প্রোটিন ও সয়া আইসোফ্ল্যাভোনও থাকে। মেনোপজের পর হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপর এসব যৌগের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে, যদিও ফলাফল সব ক্ষেত্রে একই নয়।
৫. দুধ
হাড়ের স্বাস্থ্যের সঙ্গে দুধের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এক কাপ দুধে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের পাশাপাশি ফসফরাসও পাওয়া যায়। ফসফরাস ক্যালসিয়ামের সঙ্গে মিলে হাড় ও দাঁতের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিছু দুধে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি যোগ করা থাকে। তাই কেনার সময় প্যাকেটের পুষ্টি উপাদানের তথ্য দেখে নেওয়া যেতে পারে।
৬. দই
দৈনন্দিন খাবারে সহজেই যোগ করা যায় বলে দইও হাড়ের জন্য উপকারী একটি খাবার। সাধারণ প্লেইন দইয়ে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন পাওয়া যায়। গ্রিক ইয়োগার্ট বা স্কাইর ধরনের দইয়ে তুলনামূলক বেশি প্রোটিন থাকতে পারে।
কিছু দইয়ে ভিটামিন ডিও যোগ করা হয়। গবেষণায় বেশি দই খাওয়ার সঙ্গে হাড়ের স্বাস্থ্যের কিছু ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
৭. ডাল ও অন্যান্য লেগুম
ডাল, মটরশুঁটি, মসুর, ছোলা ও অন্যান্য লেগুমে ম্যাগনেশিয়াম থাকে। হাড়ের গঠন ও শরীরে সক্রিয় ভিটামিন ডির মাত্রা বজায় রাখতে ম্যাগনেশিয়াম গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া লেগুম উদ্ভিজ্জ প্রোটিনেরও ভালো উৎস। হাড়ের পাশাপাশি পেশির স্বাস্থ্য ধরে রাখতেও পর্যাপ্ত প্রোটিন প্রয়োজন।
প্রতিদিন কতটা পুষ্টি প্রয়োজন
হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের জন্য সাধারণভাবে দৈনিক প্রয়োজনের পরিমাণ বয়স অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
- ক্যালসিয়াম: ১৯–৫০ বছর বয়সে ১,০০০ মিলিগ্রাম; ৫১ বছর থেকে ১,২০০ মিলিগ্রাম
- ভিটামিন ডি: ১৯–৭০ বছর বয়সে ১৫ মাইক্রোগ্রাম; ৭১ বছর থেকে ২০ মাইক্রোগ্রাম
- ফসফরাস: প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের জন্য ৭০০ মিলিগ্রাম
- ম্যাগনেশিয়াম: ১৯–৩০ বছর বয়সে ৩১০ মিলিগ্রাম; ৩১ বছর থেকে ৩২০ মিলিগ্রাম
- ভিটামিন কে: ৯০ মাইক্রোগ্রাম
- প্রোটিন: ন্যূনতম ০.৮ গ্রাম প্রতি কেজি শরীরের ওজন অনুযায়ী
শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে দুধ বা দই, মাছ, ডাল, বাদাম, বীজ, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার মিলিয়ে বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা তৈরি করাই ভালো। পর্যাপ্ত পুষ্টির পাশাপাশি নিয়মিত ওজন বহনকারী ব্যায়াম এবং বয়স অনুযায়ী শারীরিক সক্রিয়তাও হাড়ের স্বাস্থ্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।


























