এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লু আবারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে। ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ায় অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাসের নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় প্রাণিসম্পদ খাত, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
শুক্রবার বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা (WOAH) জানায়, ফিলিপাইনের ওরিয়েন্টাল মিন্ডোরো প্রদেশে পাখিদের মধ্যে এইচ৫এন১ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার একটি সামুদ্রিক পাখির শরীরেও অত্যন্ত সংক্রামক এইচ৫ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
ফিলিপাইনের খামারে শনাক্ত এইচ৫এন১
বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইনের ওরিয়েন্টাল মিন্ডোরো প্রদেশের কাপালান শহরের একটি পোল্ট্রি খামারে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়।
খামারটিতে থাকা ৩৯টি পাখির নমুনা পরীক্ষায় এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লু ধরা পড়ে। সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ পুরো খামারের সব পাখি নিধন করেছে। পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকা জীবাণুমুক্ত করা, নজরদারি বাড়ানো এবং আশপাশের খামারগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে।
প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার সামুদ্রিক পাখিতে শনাক্ত
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দেশটিতে প্রথমবারের মতো একটি বন্য সামুদ্রিক পাখির মধ্যে অত্যন্ত সংক্রামক এইচ৫ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রোব শহরে পাওয়া গ্রেটার ক্রেস্টেড টার্ন প্রজাতির একটি পরিযায়ী সামুদ্রিক পাখির নমুনা পরীক্ষায় ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়।
অস্ট্রেলিয়ার কৃষি ও বায়োসিকিউরিটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জুন মাস থেকে দেশটিতে মোট ১২টি এইচ৫ সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে এবং সবগুলোই পরিযায়ী সামুদ্রিক পাখির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিক পোল্ট্রি খামারে সংক্রমণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কেন উদ্বেগ বাড়ছে?
এইচ৫এন১ হলো অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের একটি অত্যন্ত সংক্রামক ধরন। এটি মূলত হাঁস, মুরগি, টার্কি ও অন্যান্য পাখির মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক মৃত্যুর কারণ হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিযায়ী পাখির মাধ্যমে ভাইরাসটি এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হলে দ্রুত নজরদারি, আক্রান্ত পাখি নিধন এবং চলাচল নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
পোল্ট্রি শিল্পে বড় প্রভাব
গত কয়েক বছরে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বার্ড ফ্লুর কারণে কোটি কোটি পোল্ট্রি ধ্বংস করতে হয়েছে।
এর ফলে—
- ডিম ও মুরগির মাংসের উৎপাদন কমে যায়।
- খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
- বাজারে দাম বেড়ে যায়।
- পোল্ট্রি খামারিদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও নিষেধাজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়।
মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লু সাধারণ মানুষের মধ্যে সহজে ছড়ায় না। তবে আক্রান্ত পাখির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এলে বিরল ক্ষেত্রে মানুষও সংক্রমিত হতে পারে।
সংক্রমিত ব্যক্তির মধ্যে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে—
- উচ্চ জ্বর
- কাশি
- গলা ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- নিউমোনিয়া
- গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রের জটিলতা
তবে এখন পর্যন্ত মানুষে-মানুষে সহজে ছড়িয়ে পড়ার মতো সক্ষমতা এই ভাইরাস অর্জন করেনি বলে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
কী ধরনের সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে?
ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে। পাশাপাশি—
- আক্রান্ত খামারের সব পাখি নিধন,
- সংক্রমিত এলাকা জীবাণুমুক্ত করা,
- পরিযায়ী পাখির ওপর পর্যবেক্ষণ জোরদার,
- খামারে বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা কঠোর করা,
- সন্দেহজনক নমুনার দ্রুত ল্যাব পরীক্ষা,
- কৃষকদের জন্য সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত শনাক্তকরণ ও কঠোর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে ভাইরাসের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে নজরদারি অব্যাহত
বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ও কৃষি কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। বিশেষ করে পরিযায়ী পাখির চলাচলের মৌসুমে নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বর্তমানে ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ায় শনাক্ত হওয়া ঘটনাগুলো পোল্ট্রি শিল্পের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত বড় আকারে বাণিজ্যিক খামারে সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি, তবুও ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।




























