ঢাকা ০৮:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হবিগঞ্জে আকস্মিক বন্যায় ২৫ গ্রাম প্লাবিত, পানিবন্দি অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ

খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে প্রবল স্রোতে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। এতে হবিগঞ্জ সদর ও আশপাশের অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আকস্মিক বন্যায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যায়। এরপর মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি আশপাশের গ্রামগুলোতে প্রবেশ করতে শুরু করে।

রাতারাতি ডুবে যায় গ্রাম

স্থানীয়দের ভাষ্য, বাঁধ ভাঙার পর প্রবল স্রোতে পানি দ্রুত বসতবাড়ি, সড়ক এবং কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবার পানি ঢোকার আগেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে পারেনি।

হঠাৎ বন্যার কারণে ঘরের আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী এবং গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। অনেক পরিবার উঁচু রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

ফসল ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি

বন্যার পানিতে নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত এবং অন্যান্য কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া গ্রামীণ সড়ক, কাঁচা রাস্তা এবং স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। অনেক স্থানে নৌকাই এখন একমাত্র চলাচলের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

বানিয়াচংয়ে বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি

একই দিন দুপুরে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায় খোয়াই নদীর আরেকটি বাঁধ ভেঙে যায়। ফলে প্রবল বেগে নদীর পানি আশপাশের হাওরে প্রবেশ করতে শুরু করে।

হাওরাঞ্চলের কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে এবং কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

চুনারুঘাটে তীব্র নদীভাঙন

বন্যার পাশাপাশি চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজার সংলগ্ন এলাকায় খোয়াই নদীর ভাঙনও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিদিনই ভাঙনের পরিধি বাড়ছে। এতে হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাসপাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

প্রশাসনের নজরদারি

স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানা গেছে।

প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর পানি পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

আরও বৃষ্টি হলে বাড়তে পারে দুর্ভোগ

আবহাওয়া ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, উজান থেকে আরও পাহাড়ি ঢল এবং ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে খোয়াই নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

মানবিক সহায়তার প্রয়োজন

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য, ওষুধ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। তাই দ্রুত ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হবিগঞ্জে আকস্মিক বন্যায় ২৫ গ্রাম প্লাবিত, পানিবন্দি অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ

Update Time : ০৫:১০:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে প্রবল স্রোতে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। এতে হবিগঞ্জ সদর ও আশপাশের অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আকস্মিক বন্যায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যায়। এরপর মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি আশপাশের গ্রামগুলোতে প্রবেশ করতে শুরু করে।

রাতারাতি ডুবে যায় গ্রাম

স্থানীয়দের ভাষ্য, বাঁধ ভাঙার পর প্রবল স্রোতে পানি দ্রুত বসতবাড়ি, সড়ক এবং কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবার পানি ঢোকার আগেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে পারেনি।

আরও পড়ুন  আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারি বর্ষণ হতে পারে ৪ বিভাগে: ৫ দিনের সতর্কবার্তা

হঠাৎ বন্যার কারণে ঘরের আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী এবং গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। অনেক পরিবার উঁচু রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

ফসল ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি

বন্যার পানিতে নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত এবং অন্যান্য কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া গ্রামীণ সড়ক, কাঁচা রাস্তা এবং স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। অনেক স্থানে নৌকাই এখন একমাত্র চলাচলের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

বানিয়াচংয়ে বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি

একই দিন দুপুরে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায় খোয়াই নদীর আরেকটি বাঁধ ভেঙে যায়। ফলে প্রবল বেগে নদীর পানি আশপাশের হাওরে প্রবেশ করতে শুরু করে।

আরও পড়ুন  বর্ষার মধ্যেই তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানাল আবহাওয়া অফিস

হাওরাঞ্চলের কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে এবং কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

চুনারুঘাটে তীব্র নদীভাঙন

বন্যার পাশাপাশি চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজার সংলগ্ন এলাকায় খোয়াই নদীর ভাঙনও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিদিনই ভাঙনের পরিধি বাড়ছে। এতে হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাসপাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

প্রশাসনের নজরদারি

স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানা গেছে।

প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর পানি পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন  ৭ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির আভাস, সিলেটে ঘণ্টায় ৬০ কিমি ঝড়ের আশঙ্কা

আরও বৃষ্টি হলে বাড়তে পারে দুর্ভোগ

আবহাওয়া ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, উজান থেকে আরও পাহাড়ি ঢল এবং ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে খোয়াই নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

মানবিক সহায়তার প্রয়োজন

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য, ওষুধ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। তাই দ্রুত ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।