স্পেনের আলমেরিয়া প্রদেশে ভয়াবহ দাবানলে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। দাবানলের ভয়াবহতা এতটাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে অনেক বাসিন্দাকে গভীর রাতে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয় পুলিশ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধারকাজ এখনো চলছে এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
৫৮ বছর বয়সী কৃষক লুই মেন্দেজ বলেন, শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন দূরে কোথাও ছোট একটি ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই চারপাশ টকটকে কমলা রঙে ঢেকে যায়। নিজের গুদামঘর থেকে কিছু কৃষি সরঞ্জাম সরানোর চেষ্টা করলেও বাতাসের গতিপথ বদলে যাওয়ায় জীবন বাঁচাতে দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া দাবানল দ্রুত বিস্তৃত হয়ে বনভূমি, কৃষিজমি এবং আবাসিক এলাকার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি ও ফসলি জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া মানুষের কাছে পৌঁছাতে উদ্ধারকারী দলগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।
কাছের একটি গ্রামের স্কুলশিক্ষিকা এলেনা বর্তমানে একটি জিমনেসিয়ামে তৈরি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, মাঝরাতে পুলিশ দরজায় কড়া নেড়ে জানায়, তাঁদের হাতে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় রয়েছে। তাড়াহুড়োর মধ্যে তিনি শুধু তাঁর পোষা বিড়াল এবং মেয়ের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সঙ্গে নিতে পেরেছেন। জীবনের বহু বছরের সঞ্চয় আগুনে পুড়ে গেছে।
বর্তমানে আলমেরিয়া অঞ্চল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মুখোমুখি। সেখানে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। এর সঙ্গে অত্যন্ত কম আর্দ্রতা এবং শক্তিশালী ঝোড়ো বাতাস যুক্ত হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগুনের গতি এতটাই বেশি ছিল যে অনেক মানুষের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগই মেলেনি।
দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৬০০-এর বেশি ফায়ার সার্ভিস কর্মী এবং পানি ছিটানোর ২০টি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং প্রবল বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক কর্মী টানা ৪৮ ঘণ্টা ধরে বিরামহীনভাবে কাজ করছেন।
দাবানলের ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি বা জমিজমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর গভীর মানসিক প্রভাবও পড়েছে স্থানীয়দের জীবনে। স্থানীয় দোকানি পেদ্রো জানান, তাঁর বহু বছরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। সেই দোকানের আয়ের ওপরই তাঁর পরিবারের জীবিকা নির্ভর করত। তিনি বলেন, তাঁরা শুধু সম্পদ নয়, নিজেদের ইতিহাস এবং স্মৃতিও হারিয়েছেন।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পুনর্গঠনে জরুরি আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার এখন নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার এবং সক্রিয় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী কয়েক দিন আরও উচ্চ তাপমাত্রার পূর্বাভাস দিয়েছে। ফলে জরুরি অবস্থা বহাল রাখা হয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে স্পেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। শুধু জুন মাসেই অতিরিক্ত গরমে দেশটিতে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম আবহাওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে দাবানলের ঝুঁকি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেলে স্যাটেলাইট চিত্রে কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শনাক্ত করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ২৫ মাইলের বেশি গতির দমকা হাওয়া আগুনকে আরও উসকে দেয়। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিশাল এলাকায়। সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রয়েছে দিগন্ত। লুই ও এলেনার মতো হাজারো মানুষ এখন শুধু নিরাপদে ঘরে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।


























