ঢাকা ০১:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্ষমতা ধরে রাখতে গোপন তৎপরতা? ইনফান্তিনোকে নিয়ে তোলপাড়

অবশেষে ফেঁসে যাচ্ছেন ফিফা প্রেসিডেন্ট, গোপন চুক্তি ফাঁস! সংগৃহীত ছবি

২০২৬ বিশ্বকাপে একের পর এক বিতর্কের মধ্যে এবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৭ সালের ফিফা নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে পুনর্নির্বাচিত করতে গোপনে সমর্থন জোগাড়ের একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। এই দাবি সামনে আসতেই ফুটবল বিশ্বে নতুন করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ চলাকালীন বিতর্কের অনেক আগেই ইনফান্তিনোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফিফার পক্ষ থেকে প্রভাবশালী ফুটবল দেশগুলোকে তাঁর প্রার্থিতাকে সমর্থনের অনুরোধ জানানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দ্য টেলিগ্রাফের তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফিফার এই অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দেয়। এমনকি বিশ্বকাপ শুরুর পর ইনফান্তিনোর প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়ে একটি চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে সেই চিঠি শেষ পর্যন্ত পাঠানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি এফএ।

এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইনফান্তিনোর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। ট্রাম্প নিজেই দাবি করেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইনফান্তিনোর কাছে বিষয়টি নিয়ে সুপারিশ করেছিলেন।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউয়েফা কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। তাদের ভাষায়, বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল নজিরবিহীন, অবিশ্বাস্য এবং সম্পূর্ণ অন্যায্য। ইউয়েফা মনে করে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ফিফা নিরপেক্ষতার সীমা অতিক্রম করেছে এবং ফুটবলের প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

ইনফান্তিনো ইস্যুতে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও চাপে পড়েছে। সংগঠনটির সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইনসহ ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রকাশ্যে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইনফান্তিনোর পদত্যাগ করা উচিত। তবে এফএ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নিতে সতর্কতা অবলম্বন করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত স্বার্থ। আগামী ২০৩১ নারী বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে ইংল্যান্ডের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পুরুষ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিতে পারে দেশটি। ফলে ফিফা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ফিফার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইনফান্তিনো টানা এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৯ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। ২০২৭ সালের নির্বাচনেও তাঁর বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়াবেন কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে।

এর অন্যতম কারণ তাঁর চালু করা ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচি। এই প্রকল্পের আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবল উন্নয়নে বিপুল অর্থায়ন করা হয়েছে। ফলে বহু জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের আয় বেড়েছে এবং তাদের অনেকেই ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।

ফিফার ২১১ সদস্য দেশের প্রত্যেকটির ভোটাধিকার রয়েছে এবং নির্বাচনে জয়ের জন্য প্রয়োজন ১০৬ ভোট। ইতোমধ্যেই দক্ষিণ আমেরিকার ১০টি দেশ, আফ্রিকার ৫৪টি দেশ এবং এশিয়ার ৪৭টি দেশ ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের সমর্থন ছাড়াই তাঁর ঝুলিতে ১১১ ভোট রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

তবে সাম্প্রতিক বিতর্ক ইনফান্তিনোর ভাবমূর্তিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ট্রাম্পের কথিত হস্তক্ষেপের ঘটনা ফুটবল বিশ্বে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার সম্ভাবনা কমেছে, তবুও এই বিতর্ক ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অনেকের মতে, এটি তাঁর বিরুদ্ধে ফুটবল অঙ্গনের প্রথম বড় ধরনের সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্ষমতা ধরে রাখতে গোপন তৎপরতা? ইনফান্তিনোকে নিয়ে তোলপাড়

Update Time : ১০:৫০:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

২০২৬ বিশ্বকাপে একের পর এক বিতর্কের মধ্যে এবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৭ সালের ফিফা নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে পুনর্নির্বাচিত করতে গোপনে সমর্থন জোগাড়ের একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। এই দাবি সামনে আসতেই ফুটবল বিশ্বে নতুন করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ চলাকালীন বিতর্কের অনেক আগেই ইনফান্তিনোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফিফার পক্ষ থেকে প্রভাবশালী ফুটবল দেশগুলোকে তাঁর প্রার্থিতাকে সমর্থনের অনুরোধ জানানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দ্য টেলিগ্রাফের তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফিফার এই অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দেয়। এমনকি বিশ্বকাপ শুরুর পর ইনফান্তিনোর প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়ে একটি চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে সেই চিঠি শেষ পর্যন্ত পাঠানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি এফএ।

আরও পড়ুন  ফ্রান্সই সেরা দল, হারের পর সুইডেন কোচের স্বীকারোক্তি

এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইনফান্তিনোর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। ট্রাম্প নিজেই দাবি করেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইনফান্তিনোর কাছে বিষয়টি নিয়ে সুপারিশ করেছিলেন।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউয়েফা কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। তাদের ভাষায়, বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল নজিরবিহীন, অবিশ্বাস্য এবং সম্পূর্ণ অন্যায্য। ইউয়েফা মনে করে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ফিফা নিরপেক্ষতার সীমা অতিক্রম করেছে এবং ফুটবলের প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

ইনফান্তিনো ইস্যুতে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও চাপে পড়েছে। সংগঠনটির সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইনসহ ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রকাশ্যে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইনফান্তিনোর পদত্যাগ করা উচিত। তবে এফএ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নিতে সতর্কতা অবলম্বন করছে।

আরও পড়ুন  রোববারই সই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি: ট্রাম্প

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত স্বার্থ। আগামী ২০৩১ নারী বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে ইংল্যান্ডের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পুরুষ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিতে পারে দেশটি। ফলে ফিফা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ফিফার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইনফান্তিনো টানা এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৯ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। ২০২৭ সালের নির্বাচনেও তাঁর বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়াবেন কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে।

এর অন্যতম কারণ তাঁর চালু করা ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচি। এই প্রকল্পের আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবল উন্নয়নে বিপুল অর্থায়ন করা হয়েছে। ফলে বহু জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের আয় বেড়েছে এবং তাদের অনেকেই ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।

আরও পড়ুন  ২৫০ বছরে কেন এত বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্র? ট্রাম্প কি মূল কারণ?

ফিফার ২১১ সদস্য দেশের প্রত্যেকটির ভোটাধিকার রয়েছে এবং নির্বাচনে জয়ের জন্য প্রয়োজন ১০৬ ভোট। ইতোমধ্যেই দক্ষিণ আমেরিকার ১০টি দেশ, আফ্রিকার ৫৪টি দেশ এবং এশিয়ার ৪৭টি দেশ ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের সমর্থন ছাড়াই তাঁর ঝুলিতে ১১১ ভোট রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

তবে সাম্প্রতিক বিতর্ক ইনফান্তিনোর ভাবমূর্তিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ট্রাম্পের কথিত হস্তক্ষেপের ঘটনা ফুটবল বিশ্বে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার সম্ভাবনা কমেছে, তবুও এই বিতর্ক ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অনেকের মতে, এটি তাঁর বিরুদ্ধে ফুটবল অঙ্গনের প্রথম বড় ধরনের সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা হতে পারে।