সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরাকের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই বুধবার ইরাকের বিভিন্ন এলাকায় যৌথভাবে এসব হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) জানিয়েছে, হামলায় তাদের অন্তত ২০ সদস্য নিহত এবং আরও ৩২ জন আহত হয়েছেন। এই হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা নতুন করে আরও বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরাকের পূর্বাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একাধিক অস্ত্র ও সামরিক সরবরাহকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, গত ৭২ ঘণ্টায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নির্দেশনায় মার্কিন সেনা ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার চেষ্টা করা হয়। এসব হামলার জবাব হিসেবেই ইরাকে পাল্টা অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও দাবি করেছে, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে তাদের তেল স্থাপনায় ড্রোন পাঠানো হয়েছিল।

হামলায় ইরাকের বাগদাদ, ওয়াসিত, নিনেভে, বসরা, কিরকুক, কারবালা ও দিয়ালা প্রদেশের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পিএমএফ। তাদের দাবি, নিনেভে ও দিয়ালা প্রদেশে চালানো হামলা ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। পিএমএফ এসব হামলাকে ইরাকের সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছে। ইরাকি প্রেসিডেন্সিও হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, দেশের সরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর এ ধরনের আক্রমণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরাকি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা কোনোভাবেই সংঘাত বাড়াতে চায় না। তবে নিজেদের নিরাপত্তার ওপর হামলা হলে আত্মরক্ষার অধিকার অনুযায়ী কঠোর জবাব দেওয়া হবে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুরকি আল-মালিকি বলেন, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল ও রিয়াদ অঞ্চলের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরাকে চালানো সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তেহরান এসব হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, মঙ্গলবার ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, সব ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, তারা জর্ডানে থাকা একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি ও কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার কথাও জানিয়েছে ইরান। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরোধ আরও গভীর হয়েছে।
সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হওয়ায় সেখানে সংঘাত বাড়লে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছায়। সৌদি আরব ও ইরানের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে ইরাকে সাম্প্রতিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কোন দিকে যায়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের বড় উদ্বেগের বিষয়।



























