মেরি সেলেস্ট রহস্য ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত সামুদ্রিক রহস্যগুলোর একটি। ১৮৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে একটি জাহাজকে ভাসতে দেখা যায়। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু জাহাজে উঠে নাবিকরা এমন এক দৃশ্য দেখেন, যা আজও ইতিহাসের অন্যতম অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
জাহাজটির নাম ছিল Mary Celeste। এটি ছিল একটি বাণিজ্যিক জাহাজ, যা নিউইয়র্ক থেকে ইতালির জেনোয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। জাহাজটির অধিনায়ক ছিলেন বেঞ্জামিন ব্রিগস। তাঁর স্ত্রী সারাহ ব্রিগস এবং দুই বছরের কন্যাও এই যাত্রায় ছিলেন। এছাড়া আরও সাতজন নাবিক জাহাজে উপস্থিত ছিলেন।
৭ নভেম্বর ১৮৭২ সালে জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। এতে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত প্রায় ১,৭০০ ব্যারেল অ্যালকোহল বহন করা হচ্ছিল। সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে জাহাজটির সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
৫ ডিসেম্বর ১৮৭২ সালে ব্রিটিশ জাহাজ Dei Gratia আটলান্টিক মহাসাগরে একটি জাহাজকে অস্বাভাবিকভাবে ভাসতে দেখে। কাছাকাছি গিয়ে তারা বুঝতে পারে সেটি Mary Celeste। কিন্তু জাহাজটির গতি অস্বাভাবিক এবং ডেকে কোনো মানুষের উপস্থিতি নেই।
নাবিকরা জাহাজে উঠে বিস্মিত হন। জাহাজটি ডুবে যায়নি, আগুনও লাগেনি। অধিকাংশ মালামাল অক্ষত ছিল। খাবার, পানীয় এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও যথাস্থানে ছিল। রান্নার সরঞ্জাম পর্যন্ত ঠিকঠাক অবস্থায় পাওয়া যায়। অথচ একজন মানুষও সেখানে ছিল না।
তদন্তে দেখা যায়, একটি লাইফবোট অনুপস্থিত ছিল। জাহাজের নেভিগেশন যন্ত্রের কিছু অংশ এবং অফিসিয়াল নথির কয়েকটি কাগজও পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ লগবুকে ২৫ নভেম্বরের তথ্য লেখা ছিল। অর্থাৎ উদ্ধার হওয়ার প্রায় ১০ দিন আগেই শেষবারের মতো সেখানে কিছু নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
ঘটনার পরপরই নানা ব্যাখ্যা সামনে আসে। কেউ বলেন জলদস্যুরা হামলা করেছিল। কিন্তু সেই ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে, কারণ জাহাজের মূল্যবান মালামাল অক্ষত ছিল। কোথাও লড়াইয়ের চিহ্নও দেখা যায়নি।
আরেকটি ব্যাখ্যা ছিল, অ্যালকোহলের বাষ্প থেকে বিস্ফোরণের আশঙ্কায় অধিনায়ক সাময়িকভাবে সবাইকে লাইফবোটে নামার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ায় লাইফবোটটি জাহাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। অনেক গবেষক এই তত্ত্বকে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন।
আবার কেউ কেউ সমুদ্রের আকস্মিক ঝড়, বিশাল ঢেউ বা নেভিগেশনজনিত ভুলের কথাও উল্লেখ করেছেন। তবে এগুলোর কোনোটির পক্ষেই চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর থেকে মেরি সেলেস্ট রহস্য নিয়ে অসংখ্য বই, প্রামাণ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। অনেকেই এটিকে “Ghost Ship” নামে পরিচিত করেন। যদিও বাস্তবে জাহাজে অতিপ্রাকৃত ঘটনার কোনো প্রমাণ কখনো পাওয়া যায়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি মূলত একটি অমীমাংসিত সামুদ্রিক রহস্য, যা সময়ের সঙ্গে নানা কল্পকাহিনির জন্ম দিয়েছে।
আজও গবেষকরা জাহাজটির প্রকৃত পরিণতি নিয়ে একমত হতে পারেননি। অধিনায়ক বেঞ্জামিন ব্রিগস, তাঁর পরিবার এবং নাবিকদের কী হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস দিতে পারেনি। আর সেই কারণেই মেরি সেলেস্ট রহস্য দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।





























