ড্যান্সিং প্লেগ রহস্য ইতিহাসের এমন একটি ঘটনা, যা আজও গবেষকদের বিস্মিত করে। ১৫১৮ সালের গ্রীষ্মে বর্তমান ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ শহরে এক নারী হঠাৎ করেই রাস্তায় নাচ শুরু করেন। প্রথমে আশপাশের মানুষ বিষয়টিকে স্বাভাবিক মনে করলেও কয়েক ঘণ্টা পর দেখা যায়, তিনি থামতেই পারছেন না। দিনের পর দিন চলতে থাকে সেই নাচ। এরপর ধীরে ধীরে আরও মানুষ তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে শুরু করে। কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েক ডজন মানুষ একইভাবে অনবরত নাচছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং সে সময়ের সরকারি নথি অনুযায়ী, অনেকেই ক্লান্তিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়তেন। কারও শরীর ফুলে যেত, কেউ অজ্ঞান হয়ে যেতেন। ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, কয়েকজনের মৃত্যু হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা চরম শারীরিক অবসাদের কারণে হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ মারা গিয়েছিল, এমন দাবি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ঘটনার শুরু হয়েছিল এক নারীকে ঘিরে, যাঁর নাম বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে ফ্রাউ ট্রোফিয়া (Frau Troffea) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়, তিনি টানা কয়েক দিন নাচতে থাকেন। এরপর শত শত মানুষ একই আচরণ করতে শুরু করেন। শহরের প্রশাসন প্রথমে ভেবেছিল, মানুষকে আরও নাচতে দিলে হয়তো এই সমস্যা দূর হবে। তাই তারা খোলা জায়গায় কাঠের মঞ্চ তৈরি করে এবং সংগীতশিল্পীদের ডেকে আনে। কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।
পরে স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা বিষয়টিকে অলৌকিক অভিশাপ বলে মনে করেন। আক্রান্তদের শহরের বাইরে সেন্ট ভিটাসের (St. Vitus) উপাসনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিশেষ প্রার্থনা, ধর্মীয় আচার এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়। ধীরে ধীরে ঘটনাটি কমে আসে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নাচের এই অদ্ভুত মহামারি থেমে যায়।
তাহলে আসলে কী ঘটেছিল? আজও এর নিশ্চিত উত্তর নেই। কিছু গবেষক মনে করেন, এটি ছিল Mass Psychogenic Illness বা গণ মানসিক প্রতিক্রিয়ার একটি বিরল উদাহরণ। সে সময় দুর্ভিক্ষ, রোগ, দারিদ্র্য ও সামাজিক আতঙ্ক মানুষের মানসিক অবস্থাকে ভেঙে দিয়েছিল। সেই চাপ থেকেই অনেক মানুষ অজান্তেই একই ধরনের আচরণে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
আরেকটি জনপ্রিয় তত্ত্ব হলো Ergot Poisoning। রাই শস্যে জন্মানো একটি ছত্রাক থেকে বিষক্রিয়ার কারণে মানুষের শরীরে খিঁচুনি বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিতে পারে। তবে আধুনিক গবেষকদের অনেকেই মনে করেন, এই তত্ত্ব পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে যথেষ্ট নয়। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিরা দিনের পর দিন ছন্দময়ভাবে নাচছিলেন, যা এই বিষক্রিয়ার সাধারণ লক্ষণের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
ইতিহাসবিদ John Waller-সহ বেশ কয়েকজন গবেষক মনে করেন, দীর্ঘদিনের সামাজিক চাপ, দুর্ভিক্ষ, রোগব্যাধি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস মিলেই এই ঘটনার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। অর্থাৎ এটি অতিপ্রাকৃত কোনো ঘটনার প্রমাণ নয়, বরং মানুষের মন, সমাজ এবং ইতিহাসের জটিল সম্পর্কের একটি বিরল উদাহরণ।
আজও ড্যান্সিং প্লেগ রহস্য ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অমীমাংসিত ঘটনা। পাঁচ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও কেন শত শত মানুষ একই সময়ে অনবরত নাচতে শুরু করেছিলেন, তার নির্ভুল উত্তর কেউ দিতে পারেননি। তাই এই ঘটনাটি ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় এখনও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।



























