ঢাকা ০৭:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৮৫ দেশ ভ্রমণে নাজমুন নাহারের অনন্য বিশ্বরেকর্ড

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৫:০৯:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫১৮

১৮৫তম দেশ ভুটান সফরে বাংলাদেশের পতাকা হাতে নাজমুন নাহার। | ছবি: সংগৃহীত

নাজমুন নাহার মানেই লাল-সবুজের পতাকা হাতে পৃথিবীর পথে এক অদম্য অভিযাত্রা। এবার সেই অভিযাত্রায় যুক্ত হলো আরও একটি ইতিহাস। গত ৭ আগস্ট ভুটান সফরের মাধ্যমে ১৮৫তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন এই বাংলাদেশি পরিব্রাজক। এর মধ্য দিয়ে প্রথম বাংলাদেশি এবং বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের অনন্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি।

নাজমুন নাহার-এর এই বিশ্বভ্রমণের গল্প এক-দুই বছরের নয়। দীর্ঘ ২৬ বছরের অভিযাত্রায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। কখনো দুর্গম পাহাড়, কখনো মরুভূমি, কখনো সমুদ্র কিংবা প্রত্যন্ত দ্বীপ—যেখানেই গেছেন, সঙ্গী ছিল বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। এ পর্যন্ত বিশ্বের ১ হাজার ২৯৪টিরও বেশি স্থানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে ধরেছেন তিনি।

তার এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। দুর্গম সীমান্ত, দীর্ঘ স্থলপথ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে তাকে। অনেক সময় জীবনঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভয় বা অনিশ্চয়তা তাকে থামাতে পারেনি। একের পর এক দেশের সীমানা পেরিয়ে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে গেছেন তিনি।

বিশ্বভ্রমণের শুরু ২০০০ সালে। ভারতের একটি আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ এই যাত্রার সূচনা হয়। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে দেশের সংখ্যা। ২০১৮ সালের ১ জুন জিম্বাবুয়ে সফরের মাধ্যমে ১০০তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক অর্জন করেন তিনি।

এরপর ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর সাও টোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপে সফরের মাধ্যমে ১৫০তম দেশে পৌঁছান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভানুয়াতু সফরে ১৭৫তম দেশের মাইলফলক স্পর্শ করেন। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামা সফরের মাধ্যমে তার ভ্রমণসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮৪-তে। সর্বশেষ ভুটান সফরে সেই সংখ্যা পৌঁছেছে ১৮৫-তে।

ভুটান সফর নিয়ে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে নাজমুন নাহার বলেন, ১৮৫তম দেশ হিসেবে ভুটান তার কাছে ছিল বিশেষ রোমাঞ্চকর। পারো, থিম্পু, পুনাখা, ডোচুলা, বুমথাং, ফোবজিখা ও হা ভ্যালিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন তিনি। পাহাড়, হিমালয়ের পর্বতশ্রেণি, সবুজ উপত্যকা ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি তাকে মুগ্ধ করেছে।

তবে শুধু ভ্রমণের রেকর্ড তৈরি করাই তার লক্ষ্য নয়। বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার কাজও করে চলেছেন তিনি। বিভিন্ন দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্জনের কথা তুলে ধরেছেন।

আন্তর্জাতিক মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবেও কাজ করছেন নাজমুন নাহার। তরুণদের সাহসী হতে, নেতৃত্ব দিতে, নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করতে এবং মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করতে উৎসাহ দেন তিনি। আন্তর্জাতিক TEDx প্ল্যাটফর্মেও বক্তব্য দিয়েছেন এই পরিব্রাজক।

ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন সামাজিক ও মানবিক বার্তাও। ‘নো ওয়ার, অনলি পিস’, ‘সেভ দ্য প্ল্যানেট’ এবং ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ’-এর মতো বার্তা নিয়ে কাজ করছেন তিনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুদের সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিক কার্যক্রমেও যুক্ত হয়েছেন।

দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণ ও মানবিক কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন অসংখ্যবার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৭০টির বেশি পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পান মর্যাদাপূর্ণ ‘পিস টর্চ বিয়ারার অ্যাওয়ার্ড’। ২০১৮ সালে জাম্বিয়া সরকার তাকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ এবং ২০২৩ সালে সেন্ট লুসিয়ার প্রধানমন্ত্রী তাকে ‘ব্রেভ গার্ল’ উপাধিতে সম্মানিত করেন।

লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া নাজমুন নাহার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এশিয়ান স্টাডিজ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এশিয়া’ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেন।

১৮৫টি দেশ ভ্রমণের এই অর্জন শুধু একটি সংখ্যার রেকর্ড নয়। এটি একজন বাংলাদেশি নারীর সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের গল্প। লাল-সবুজের পতাকা হাতে বিশ্বের পথে তার দীর্ঘ অভিযাত্রা প্রমাণ করেছে, বড় স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য অদম্যভাবে এগিয়ে যাওয়াও সম্ভব।

জনপ্রিয় সংবাদ

১৮৫ দেশ ভ্রমণে নাজমুন নাহারের অনন্য বিশ্বরেকর্ড

Update Time : ০৫:০৯:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

নাজমুন নাহার মানেই লাল-সবুজের পতাকা হাতে পৃথিবীর পথে এক অদম্য অভিযাত্রা। এবার সেই অভিযাত্রায় যুক্ত হলো আরও একটি ইতিহাস। গত ৭ আগস্ট ভুটান সফরের মাধ্যমে ১৮৫তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন এই বাংলাদেশি পরিব্রাজক। এর মধ্য দিয়ে প্রথম বাংলাদেশি এবং বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের অনন্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি।

নাজমুন নাহার-এর এই বিশ্বভ্রমণের গল্প এক-দুই বছরের নয়। দীর্ঘ ২৬ বছরের অভিযাত্রায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। কখনো দুর্গম পাহাড়, কখনো মরুভূমি, কখনো সমুদ্র কিংবা প্রত্যন্ত দ্বীপ—যেখানেই গেছেন, সঙ্গী ছিল বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। এ পর্যন্ত বিশ্বের ১ হাজার ২৯৪টিরও বেশি স্থানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে ধরেছেন তিনি।

তার এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। দুর্গম সীমান্ত, দীর্ঘ স্থলপথ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে তাকে। অনেক সময় জীবনঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভয় বা অনিশ্চয়তা তাকে থামাতে পারেনি। একের পর এক দেশের সীমানা পেরিয়ে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে গেছেন তিনি।

আরও পড়ুন  Switzerland ভ্রমণ: আল্পস পাহাড় ও তুষারের দেশে যাওয়ার গাইড

বিশ্বভ্রমণের শুরু ২০০০ সালে। ভারতের একটি আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ এই যাত্রার সূচনা হয়। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে দেশের সংখ্যা। ২০১৮ সালের ১ জুন জিম্বাবুয়ে সফরের মাধ্যমে ১০০তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক অর্জন করেন তিনি।

এরপর ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর সাও টোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপে সফরের মাধ্যমে ১৫০তম দেশে পৌঁছান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভানুয়াতু সফরে ১৭৫তম দেশের মাইলফলক স্পর্শ করেন। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামা সফরের মাধ্যমে তার ভ্রমণসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮৪-তে। সর্বশেষ ভুটান সফরে সেই সংখ্যা পৌঁছেছে ১৮৫-তে।

ভুটান সফর নিয়ে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে নাজমুন নাহার বলেন, ১৮৫তম দেশ হিসেবে ভুটান তার কাছে ছিল বিশেষ রোমাঞ্চকর। পারো, থিম্পু, পুনাখা, ডোচুলা, বুমথাং, ফোবজিখা ও হা ভ্যালিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন তিনি। পাহাড়, হিমালয়ের পর্বতশ্রেণি, সবুজ উপত্যকা ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি তাকে মুগ্ধ করেছে।

আরও পড়ুন  কিয়োটো ভ্রমণ: জাপানের ঐতিহ্য ও চেরি ফুলের অসাধারণ অভিজ্ঞতা

তবে শুধু ভ্রমণের রেকর্ড তৈরি করাই তার লক্ষ্য নয়। বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার কাজও করে চলেছেন তিনি। বিভিন্ন দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্জনের কথা তুলে ধরেছেন।

আন্তর্জাতিক মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবেও কাজ করছেন নাজমুন নাহার। তরুণদের সাহসী হতে, নেতৃত্ব দিতে, নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করতে এবং মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করতে উৎসাহ দেন তিনি। আন্তর্জাতিক TEDx প্ল্যাটফর্মেও বক্তব্য দিয়েছেন এই পরিব্রাজক।

ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন সামাজিক ও মানবিক বার্তাও। ‘নো ওয়ার, অনলি পিস’, ‘সেভ দ্য প্ল্যানেট’ এবং ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ’-এর মতো বার্তা নিয়ে কাজ করছেন তিনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুদের সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিক কার্যক্রমেও যুক্ত হয়েছেন।

আরও পড়ুন  সাজেক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ

দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণ ও মানবিক কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন অসংখ্যবার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৭০টির বেশি পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পান মর্যাদাপূর্ণ ‘পিস টর্চ বিয়ারার অ্যাওয়ার্ড’। ২০১৮ সালে জাম্বিয়া সরকার তাকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ এবং ২০২৩ সালে সেন্ট লুসিয়ার প্রধানমন্ত্রী তাকে ‘ব্রেভ গার্ল’ উপাধিতে সম্মানিত করেন।

লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া নাজমুন নাহার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এশিয়ান স্টাডিজ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এশিয়া’ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেন।

১৮৫টি দেশ ভ্রমণের এই অর্জন শুধু একটি সংখ্যার রেকর্ড নয়। এটি একজন বাংলাদেশি নারীর সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের গল্প। লাল-সবুজের পতাকা হাতে বিশ্বের পথে তার দীর্ঘ অভিযাত্রা প্রমাণ করেছে, বড় স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য অদম্যভাবে এগিয়ে যাওয়াও সম্ভব।