ঢাকা ০৫:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্যানসার ভ্যাকসিনে নতুন আশা, কমতে পারে ফিরে আসার ঝুঁকি

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৪:৪৩:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫০৫

রোগীর ক্যানসারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি হচ্ছে ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিন। | ছবি: সংগৃহীত

ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না ও এমএসডির যৌথ গবেষণায় অস্ত্রোপচারের পর উচ্চঝুঁকির মেলানোমা রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন ব্যবহারে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। ভ্যাকসিনটির সঙ্গে ইমিউনোথেরাপি ওষুধ ব্যবহারে রোগীদের দীর্ঘ সময় ক্যানসারমুক্ত রাখার সম্ভাবনা দেখা গেছে।

এই ভ্যাকসিনের বিশেষত্ব হলো, এটি সবার জন্য একইভাবে তৈরি করা হয় না। রোগীর শরীরে থাকা ক্যানসারের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তার জন্য আলাদাভাবে ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়। এ কারণেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়াটি শুরু হয় রোগীর টিউমারের নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে। অস্ত্রোপচারের সময় টিউমারের একটি অংশ নিয়ে তার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষায় ক্যানসার কোষে থাকা নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন খুঁজে বের করা হয়। পরে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোগীর জন্য বিশেষ এমআরএনএ ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়।

এই ক্যানসার ভ্যাকসিন মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে প্রশিক্ষিত করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি। অর্থাৎ রোগীর শরীরের প্রতিরোধী কোষগুলোকে ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য চিনতে সাহায্য করা হয়। এরপর রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ওই কোষগুলোকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করতে পারে—এমনটাই গবেষকদের প্রত্যাশা।

ফেজ-৩ পর্যায়ের পরীক্ষায় এক হাজারের বেশি উচ্চঝুঁকির মেলানোমা রোগী অংশ নেন। অস্ত্রোপচারের পর তাদের একদলকে কিট্রুডা দেওয়া হয়। অন্যদল কিট্রুডার পাশাপাশি ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিন পেয়েছেন। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, দুই চিকিৎসা একসঙ্গে পাওয়া রোগীদের মধ্যে ক্যানসারমুক্ত থাকার সময় তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। শরীরের অন্য অংশে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

তবে গবেষকেরা এখনই এই পদ্ধতিকে চূড়ান্ত চিকিৎসা হিসেবে দেখছেন না। এর সুফল কতদিন স্থায়ী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রোগীদের ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা জানতে আরও তথ্য প্রয়োজন। গবেষণাটির বিস্তারিত ফলাফল আগামী অক্টোবরে একটি মেডিকেল সম্মেলনে উপস্থাপন করার কথা জানিয়েছে মডার্না ও এমএসডি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রোগীর ক্যানসারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে চিকিৎসার কেন্দ্রে রাখা। এনএইচএস ইংল্যান্ডের ক্যানসার বিভাগের জাতীয় ক্লিনিক্যাল পরিচালক অধ্যাপক পিটার জনসনের মতে, এই পদ্ধতি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও নির্দিষ্টভাবে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ড. লেনার্ড লিওও মনে করেন, গবেষণাটি রোগীর নিজের ক্যানসারকে লক্ষ্য করে তৈরি ভ্যাকসিনের সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। মেলানোমার পাশাপাশি ফুসফুস, মূত্রথলি ও কিডনি ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভ্যাকসিন নিয়ে পরীক্ষা চলছে।

তবে এখনো সাধারণ রোগীদের জন্য এই চিকিৎসা চালু হয়নি। ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ফলে গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও এটিকে এখনই নিশ্চিত বা সর্বজনীন ক্যানসার চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

তারপরও ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন নিয়ে এই গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। ভবিষ্যতে রোগীর ক্যানসারের ধরন ও জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদা চিকিৎসা দেওয়ার পথ আরও বিস্তৃত হতে পারে। গবেষণার পরবর্তী ফলাফল ও দীর্ঘমেয়াদি তথ্যই বলে দেবে এই প্রযুক্তি ক্যানসার চিকিৎসায় কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্যানসার ভ্যাকসিনে নতুন আশা, কমতে পারে ফিরে আসার ঝুঁকি

Update Time : ০৪:৪৩:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না ও এমএসডির যৌথ গবেষণায় অস্ত্রোপচারের পর উচ্চঝুঁকির মেলানোমা রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন ব্যবহারে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। ভ্যাকসিনটির সঙ্গে ইমিউনোথেরাপি ওষুধ ব্যবহারে রোগীদের দীর্ঘ সময় ক্যানসারমুক্ত রাখার সম্ভাবনা দেখা গেছে।

এই ভ্যাকসিনের বিশেষত্ব হলো, এটি সবার জন্য একইভাবে তৈরি করা হয় না। রোগীর শরীরে থাকা ক্যানসারের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তার জন্য আলাদাভাবে ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়। এ কারণেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়াটি শুরু হয় রোগীর টিউমারের নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে। অস্ত্রোপচারের সময় টিউমারের একটি অংশ নিয়ে তার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষায় ক্যানসার কোষে থাকা নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন খুঁজে বের করা হয়। পরে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোগীর জন্য বিশেষ এমআরএনএ ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়।

আরও পড়ুন  বর্ষাকালে ক্যামেরা ও লেন্স সুরক্ষার ১২ কার্যকর টিপস

এই ক্যানসার ভ্যাকসিন মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে প্রশিক্ষিত করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি। অর্থাৎ রোগীর শরীরের প্রতিরোধী কোষগুলোকে ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য চিনতে সাহায্য করা হয়। এরপর রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ওই কোষগুলোকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করতে পারে—এমনটাই গবেষকদের প্রত্যাশা।

ফেজ-৩ পর্যায়ের পরীক্ষায় এক হাজারের বেশি উচ্চঝুঁকির মেলানোমা রোগী অংশ নেন। অস্ত্রোপচারের পর তাদের একদলকে কিট্রুডা দেওয়া হয়। অন্যদল কিট্রুডার পাশাপাশি ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিন পেয়েছেন। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, দুই চিকিৎসা একসঙ্গে পাওয়া রোগীদের মধ্যে ক্যানসারমুক্ত থাকার সময় তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। শরীরের অন্য অংশে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন  টেলিগ্রাম অ্যাপ স্টোর: হঠাৎ উধাও, অবশেষে সামনে এলো বড় কারণ?

তবে গবেষকেরা এখনই এই পদ্ধতিকে চূড়ান্ত চিকিৎসা হিসেবে দেখছেন না। এর সুফল কতদিন স্থায়ী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রোগীদের ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা জানতে আরও তথ্য প্রয়োজন। গবেষণাটির বিস্তারিত ফলাফল আগামী অক্টোবরে একটি মেডিকেল সম্মেলনে উপস্থাপন করার কথা জানিয়েছে মডার্না ও এমএসডি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রোগীর ক্যানসারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে চিকিৎসার কেন্দ্রে রাখা। এনএইচএস ইংল্যান্ডের ক্যানসার বিভাগের জাতীয় ক্লিনিক্যাল পরিচালক অধ্যাপক পিটার জনসনের মতে, এই পদ্ধতি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও নির্দিষ্টভাবে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ড. লেনার্ড লিওও মনে করেন, গবেষণাটি রোগীর নিজের ক্যানসারকে লক্ষ্য করে তৈরি ভ্যাকসিনের সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। মেলানোমার পাশাপাশি ফুসফুস, মূত্রথলি ও কিডনি ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভ্যাকসিন নিয়ে পরীক্ষা চলছে।

আরও পড়ুন  রাশিয়ার ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তাব দিল রোসাটম, বাংলাদেশে নতুন সম্ভাবনা

তবে এখনো সাধারণ রোগীদের জন্য এই চিকিৎসা চালু হয়নি। ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ফলে গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও এটিকে এখনই নিশ্চিত বা সর্বজনীন ক্যানসার চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

তারপরও ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন নিয়ে এই গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। ভবিষ্যতে রোগীর ক্যানসারের ধরন ও জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদা চিকিৎসা দেওয়ার পথ আরও বিস্তৃত হতে পারে। গবেষণার পরবর্তী ফলাফল ও দীর্ঘমেয়াদি তথ্যই বলে দেবে এই প্রযুক্তি ক্যানসার চিকিৎসায় কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে।