ঢাকা ০১:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্টিভ জবসের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল যে সিনেমা

পিক্সারের অ্যানিমেশন ও স্টিভ জবসের যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ছবি: সংগৃহীত

স্টিভ জবসের টয় স্টোরি বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে অ্যাপল, আইফোন কিংবা ম্যাকবুকের মতো বিপ্লব ঘটানো সব প্রযুক্তিপণ্য। কিন্তু ১৯৮৫ সালে নিজের প্রতিষ্ঠিত অ্যাপল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর স্টিভ জবসের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি এসেছিল একদম ভিন্ন এক জগৎ—চলচ্চিত্র শিল্প থেকে। অ্যাপল ছেড়ে দেওয়ার পর ১৯৮৬ সালে তিনি বিখ্যাত নির্মাতা জর্জ লুকাসের কাছ থেকে লুকাসফিল্মের কম্পিউটার গ্রাফিকস বিভাগটি কিনে নেন এবং সেটির নাম দেন পিক্সার। তখনকার সময়ে কম্পিউটার গ্রাফিকস দিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা বানানোর কথা কেউ কল্পনাও করতে পারত না, কিন্তু জবস সেই প্রযুক্তির অপার সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছিলেন।

শুরুর দিকে পিক্সার মূলত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাফিকস কম্পিউটার ও সফটওয়্যার বিক্রির ব্যবসা করত, যা খুব একটা লাভজনক ছিল না। তবে কোম্পানির ভেতরে অ্যানিমেটর জন ল্যাসেটার এবং এড ক্যাটমুলের নেতৃত্বাধীন তরুণ দলটি কম্পিউটার অ্যানিমেশনের মাধ্যমে গল্প বলার নতুন এক স্বপ্ন দেখছিল। ১৯৮৮ সালে তাঁদের তৈরি ছোট অ্যানিমেশন ‘টিন টয়’ অস্কার জয় করে অ্যানিমেশন ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ে। ব্যবসায়িক সংকট সত্ত্বেও জবস নিজের পকেট থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে পিক্সারকে টিকিয়ে রেখেছিলেন।

১৯ ৯০-এর দশকের শুরুতে সেই জমানো স্বপ্নই বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে এবং জন্ম নেয় কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘টয় স্টোরি’। সম্পূর্ণ কম্পিউটার অ্যানিমেশন দিয়ে একটি পুরো সিনেমা তৈরি করা ছিল তৎকালীন সময়ে পিক্সার ও স্টিভ জবসের জন্য বিশাল এক জুয়া। ১৯৯১ সালে ডিজনি স্টুডিওর সঙ্গে যৌথভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের চুক্তি হলেও প্রথম দিকের চিত্রনাট্য নিয়ে জটিলতায় কাজ সাময়িকভাবে থমকে যায়। পরবর্তীতে উডি ও বাজ লাইটইয়ারের চরিত্র পুনর্গঠন করে বন্ধুত্বের অনন্য গল্প সাজানো হয়, যা অ্যানিমেশনের জগতে নতুন যুগের সূচনা করে।

১৯৯৫ সালের ২২ নভেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পর স্টিভ জবসের টয় স্টোরি সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে অভাবনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করে। মাত্র ৩০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের এই সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ৩৬৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে সেই বছরের সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। টম হ্যাঙ্কস ও টিম অ্যালেনের কণ্ঠ দেওয়া উডি ও বাজ লাইটইয়ারের কেমিস্ট্রি দর্শকদের মুগ্ধ করে। কম্পিউটার প্রযুক্তি দিয়ে যে মানুষের গভীর আবেগ ও অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব, তা বিশ্ববাসীকে প্রথমবারের মতো প্রমাণ করে দেখায় পিক্সার।

‘টয় স্টোরি’র অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্যের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় পিক্সার শেয়ারবাজারে আইপিও (IPO) ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শেয়ারবাজারে পিক্সারের বাজারমূল্য দ্রুত ১.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়, যা স্টিভ জবসকে রাতারাতি একজন বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী হিসেবে নতুন পরিচিতি দেয়। অ্যাপল থেকে বিতাড়িত হয়ে যে অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি দিন কাটাচ্ছিলেন, পিক্সারের এই সাফল্য তাঁর সেই হারানো আর্থিক ও ব্যবসায়িক অবস্থান বহুগুণ শক্তিশালী করে ফিরিয়ে আনে। স্টিভ জবসের টয় স্টোরি কেবল পিক্সারকে শীর্ষে তোলেনি, বরং স্টিভ জবসের ব্যক্তিগত ঘুরে দাঁড়ানোর পথকেও মসৃণ করেছিল।

পরবর্তীতে ‘টয় স্টোরি’র পথ ধরে পিক্সার একে একে ‘আ বাগস লাইফ’, ‘মনস্টারস ইনক’ ও ‘ফাইন্ডিং নিমো’র মতো একের পর এক সুপারহিট সিনেমা উপহার দেয়। ১৯৯৬ সালে অ্যাপল যখন জবসের তৈরি ‘নেক্সট’ কোম্পানিটি অধিগ্রহণ করে, তখন তিনি পুনরায় অ্যাপলে ফিরে যাওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ পান। অবশেষে ২০০৬ সালে ডিজনি ৭.৪ বিলিয়ন ডলারে পিক্সারকে কিনে নিলে স্টিভ জবস ডিজনির সর্ববৃহৎ একক শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হন। এভাবেই স্টিভ জবসের টয় স্টোরি প্রযুক্তি ও চলচ্চিত্রের মেলবন্ধনে এক ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্য লিখে যায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্টিভ জবসের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল যে সিনেমা

Update Time : ১১:১২:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

স্টিভ জবসের টয় স্টোরি বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে অ্যাপল, আইফোন কিংবা ম্যাকবুকের মতো বিপ্লব ঘটানো সব প্রযুক্তিপণ্য। কিন্তু ১৯৮৫ সালে নিজের প্রতিষ্ঠিত অ্যাপল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর স্টিভ জবসের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি এসেছিল একদম ভিন্ন এক জগৎ—চলচ্চিত্র শিল্প থেকে। অ্যাপল ছেড়ে দেওয়ার পর ১৯৮৬ সালে তিনি বিখ্যাত নির্মাতা জর্জ লুকাসের কাছ থেকে লুকাসফিল্মের কম্পিউটার গ্রাফিকস বিভাগটি কিনে নেন এবং সেটির নাম দেন পিক্সার। তখনকার সময়ে কম্পিউটার গ্রাফিকস দিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা বানানোর কথা কেউ কল্পনাও করতে পারত না, কিন্তু জবস সেই প্রযুক্তির অপার সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছিলেন।

শুরুর দিকে পিক্সার মূলত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাফিকস কম্পিউটার ও সফটওয়্যার বিক্রির ব্যবসা করত, যা খুব একটা লাভজনক ছিল না। তবে কোম্পানির ভেতরে অ্যানিমেটর জন ল্যাসেটার এবং এড ক্যাটমুলের নেতৃত্বাধীন তরুণ দলটি কম্পিউটার অ্যানিমেশনের মাধ্যমে গল্প বলার নতুন এক স্বপ্ন দেখছিল। ১৯৮৮ সালে তাঁদের তৈরি ছোট অ্যানিমেশন ‘টিন টয়’ অস্কার জয় করে অ্যানিমেশন ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ে। ব্যবসায়িক সংকট সত্ত্বেও জবস নিজের পকেট থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে পিক্সারকে টিকিয়ে রেখেছিলেন।

আরও পড়ুন  আইফোন ১৮ প্রো লঞ্চের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ, সেপ্টেম্বরেই আসছে নতুন আইফোন?

১৯ ৯০-এর দশকের শুরুতে সেই জমানো স্বপ্নই বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে এবং জন্ম নেয় কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘টয় স্টোরি’। সম্পূর্ণ কম্পিউটার অ্যানিমেশন দিয়ে একটি পুরো সিনেমা তৈরি করা ছিল তৎকালীন সময়ে পিক্সার ও স্টিভ জবসের জন্য বিশাল এক জুয়া। ১৯৯১ সালে ডিজনি স্টুডিওর সঙ্গে যৌথভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের চুক্তি হলেও প্রথম দিকের চিত্রনাট্য নিয়ে জটিলতায় কাজ সাময়িকভাবে থমকে যায়। পরবর্তীতে উডি ও বাজ লাইটইয়ারের চরিত্র পুনর্গঠন করে বন্ধুত্বের অনন্য গল্প সাজানো হয়, যা অ্যানিমেশনের জগতে নতুন যুগের সূচনা করে।

আরও পড়ুন  কৃতি শ্যাননের বিজ্ঞাপন নিয়ে তুমুল বিতর্ক, উঠল যেসব প্রশ্ন

১৯৯৫ সালের ২২ নভেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পর স্টিভ জবসের টয় স্টোরি সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে অভাবনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করে। মাত্র ৩০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের এই সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ৩৬৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে সেই বছরের সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। টম হ্যাঙ্কস ও টিম অ্যালেনের কণ্ঠ দেওয়া উডি ও বাজ লাইটইয়ারের কেমিস্ট্রি দর্শকদের মুগ্ধ করে। কম্পিউটার প্রযুক্তি দিয়ে যে মানুষের গভীর আবেগ ও অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব, তা বিশ্ববাসীকে প্রথমবারের মতো প্রমাণ করে দেখায় পিক্সার।

‘টয় স্টোরি’র অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্যের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় পিক্সার শেয়ারবাজারে আইপিও (IPO) ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শেয়ারবাজারে পিক্সারের বাজারমূল্য দ্রুত ১.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়, যা স্টিভ জবসকে রাতারাতি একজন বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী হিসেবে নতুন পরিচিতি দেয়। অ্যাপল থেকে বিতাড়িত হয়ে যে অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি দিন কাটাচ্ছিলেন, পিক্সারের এই সাফল্য তাঁর সেই হারানো আর্থিক ও ব্যবসায়িক অবস্থান বহুগুণ শক্তিশালী করে ফিরিয়ে আনে। স্টিভ জবসের টয় স্টোরি কেবল পিক্সারকে শীর্ষে তোলেনি, বরং স্টিভ জবসের ব্যক্তিগত ঘুরে দাঁড়ানোর পথকেও মসৃণ করেছিল।

আরও পড়ুন  পরীমণির মন্তব্যে ভাইরাল বাগেরহাট কুমিরের ঘটনা | কুকুর নিয়ে ভিডিওতে তোলপাড়

পরবর্তীতে ‘টয় স্টোরি’র পথ ধরে পিক্সার একে একে ‘আ বাগস লাইফ’, ‘মনস্টারস ইনক’ ও ‘ফাইন্ডিং নিমো’র মতো একের পর এক সুপারহিট সিনেমা উপহার দেয়। ১৯৯৬ সালে অ্যাপল যখন জবসের তৈরি ‘নেক্সট’ কোম্পানিটি অধিগ্রহণ করে, তখন তিনি পুনরায় অ্যাপলে ফিরে যাওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ পান। অবশেষে ২০০৬ সালে ডিজনি ৭.৪ বিলিয়ন ডলারে পিক্সারকে কিনে নিলে স্টিভ জবস ডিজনির সর্ববৃহৎ একক শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হন। এভাবেই স্টিভ জবসের টয় স্টোরি প্রযুক্তি ও চলচ্চিত্রের মেলবন্ধনে এক ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্য লিখে যায়।