কংক্রিটের এই আধুনিক যুগে যখন আমরা বিলাসবহুল হোটেল বা আরামদায়ক রিসোর্টে থাকতে অভ্যস্ত, তখন আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে ক্লান্ত পথিকের আশ্রয়স্থল ঠিক কেমন ছিল? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে।
আজ আমরা জানবো চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার দক্ষিণ ভূর্ষি ইউনিয়নের ঠিক এমনই এক পটিয়ার প্রাচীন পান্থশালা ও এর নেপথ্যের অজানা গল্প, যা একসময় ছিল শত শত মানুষের নির্ভরতার প্রধান প্রতীক।
সময়টা আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগের। গ্রাম-বাংলায় সেকালে আজকের মতো আধুনিক পিচঢালা সড়ক বা দ্রুতগতির কোনো যানবাহনের অস্তিত্ব ছিল না। তখন কর্ণফুলী নদী হয়ে বোয়ালখালী, চানখালী ও খান মোহনা খাল দিয়ে সওদাগরী নৌকায় যাতায়াত করতেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়ীরা।

মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে বা নৌকায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ক্লান্ত পথিকেরা রাতের বেলা খুঁজতেন একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা। যেখানে তারা একটু বিশ্রাম নিয়ে পরদিন আবার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারেন। সাধারণ পথচারীদের এই অমানবিক কষ্ট লাঘবের উদ্দেশ্যেই ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে (ইংরেজী ১৯২৭ সাল) স্থানীয় প্রতাপশালী জমিদার জগত চন্দ্র মহাজন নির্মাণ করেন এই ঐতিহাসিক পান্থশালাটি।
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দূর-দূরান্ত থেকে আসা যেকোনো মানুষের জন্য এই দোতলা ভবনে থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এটি ছিল সেকালের এক অনন্য সমাজসেবা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নিদর্শন। ক্লান্ত পথিকের তেষ্টা মেটাতে পান্থশালার পাশেই প্রায় ৪ একর জায়গা জুড়ে তিনি খনন করেন এক বিশাল দীঘি। এই সুবিশাল দীঘির সুপেয় পানি সেকালের পরিশ্রান্ত পথিকদের দিত পরম প্রশান্তি।
এই পান্থশালার পাশ দিয়ে বয়ে চলা খালের অপর পাড়েই ছিল বিখ্যাত ‘পেচাখালি বাজার’। ঐতিহ্যবাহী এই বাজারটি প্রতি সপ্তাহের সোম ও শুক্রবার হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই খরস্রোতা খান মোহনা খাল আজ শুকিয়ে পরিণত হয়েছে এক সরু নর্দমায়। রাস্তাঘাটের অভাবনীয় উন্নয়ন আর যানবাহনের সহজলভ্যতায় আধুনিক যুগের মানুষের আর এই পান্থশালার প্রয়োজন পড়ে না।
১৯৪৬ সালে জমিদার জগত চন্দ্রের মৃত্যুর পর তার বিশাল জমিদারিও একসময় হাতছাড়া হয়ে যায়। আর এর সাথেই কালের অতল গর্ভে হারিয়ে যেতে শুরু করে সেকালের সব জৌলুস।আধুনিকতার ছোঁয়ায় এমন অনেক পান্থশালাই আজ আমাদের সমাজ থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে জগত চন্দ্র মহাজনের এই পটিয়ার প্রাচীন পান্থশালা এখনো কোনোমতে টিকে আছে অতীতের এক গৌরবময় স্মৃতিচিহ্ন হয়ে।
কে জানে, উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে হয়তো আর কিছুদিন পর এটিও চিরতরে হারিয়ে যাবে কালের গহ্বরে। তবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সন্ধানে আগ্রহীরা এখনো ছুটে যান অতীতের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নিদর্শনটিকে এক নজর দেখতে।


























