ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানা আধুনিকায়নের মাধ্যমে দ্রুত সচল করা এবং কারখানাটির পূর্বনাম ‘আশুগঞ্জ জিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড’ পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিক-কর্মচারীরা। সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আশুগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর টোল প্লাজা এলাকায় এএফসিসিএল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের উদ্যোগে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভকারীরা নিজেদের দাবি আদায়ে কিছু সময়ের জন্য ব্যস্ততম ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। শ্রমিক-কর্মচারীদের এই যৌক্তিক দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া সিএনজি, ট্রাক ও রিকশা মালিক সমিতি এবং আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সিবিএ নেতাকর্মীরাও এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে শ্রমিকদের দাবির প্রতি জোরালো সমর্থন জানান।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আশুগঞ্জ সার কারখানা বন্ধ থাকায় শুধু কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরাই নন, বরং এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো এলাকার স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর। গত ২০২৫ সালের ১ মার্চ থেকে কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ থাকায় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক পরিবার চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছে। শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, ২০১০ সালের পর থেকে একটি বিশেষ মহলের স্বার্থে দেশীয় সার কারখানাগুলো পরিকল্পিতভাবে বন্ধ রেখে বিদেশ থেকে সার আমদানির প্রবণতা বাড়ানো হয়েছে।
এর ফলে দেশের সার কারখানাগুলো যান্ত্রিক ও আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মতে, এখনই আধুনিকায়নের মাধ্যমে বন্ধ থাকা কারখানাগুলো পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। দেশের সব সার কারখানা যদি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা যায়, তবে আমদানি নির্ভরতা অনেকাংশে কমার পাশাপাশি সরকারের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং দেশের কৃষি খাত আরও বেশি শক্তিশালী হবে।
বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা সরকারের আমদানি নীতির সমালোচনা করে বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকটের কারণে অতীতে সার ও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং বিশ্ববাজারে সারের দাম বহুগুণ বেড়েছে। বিদেশ থেকে এই সার আমদানিতে প্রতি বছর সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অথচ দেশে সার উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কারখানাগুলো এভাবে বন্ধ রাখা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। তারা প্রশ্ন তোলেন, জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকা ব্যয় করে বেশি দামে বিদেশ থেকে সার আমদানি করার আসলেই কোনো প্রয়োজন আছে কি না।
ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের স্বার্থের পরিবর্তে কৃষক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশীয় সার উৎপাদন বাড়ানোর জোর দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে সমাবেশে বক্তারা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আশুগঞ্জ সার কারখানাকে দ্রুত আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি কারখানাটির পূর্বনাম ‘আশুগঞ্জ জিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড’ পুনর্বহালের দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
এএফসিসিএল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি বজলুর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু কাউসার, সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর রহমান, কারখানার উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং অফিসার্স ইউনিয়নের সভাপতি আনোয়ার হোসেন।
এছাড়াও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেত্রী জয়ন্তী বিশ্বাস, আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নোয়াব আলী মুন্সী, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির শাহজাহান ভূঁইয়া, উপজেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক সোহেল পারভেজ, উপজেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শাহআলম এবং উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি মো. আব্দুল কুদ্দুস। কর্মসূচি থেকে ‘শিল্প বাঁচাও, কর্মসংস্থান বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’— স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত করে তোলা হয়। সমাবেশ থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা দ্রুত কারখানাটি আধুনিকায়ন করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা, সবার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং কারখানার পূর্বনাম পুনর্বহালে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগের দাবি জানান।



























