দেশের গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় সংসদে যুক্ত হলো ইতিহাসের নতুন অনুষঙ্গ। জাতীয় সংসদের বিভিন্ন গ্যালারির নামকরণ করা হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা দেখানো সাত বীরশ্রেষ্ঠের নামে। রাষ্ট্রীয় পরিসরে এই সিদ্ধান্তকে দেখা হচ্ছে গভীর শ্রদ্ধা ও স্মৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরামর্শে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সংসদ ভবনের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা স্থায়ীভাবে স্থান পেল। আগে এসব গ্যালারির নাম ছিল ফুল, নদী কিংবা সাধারণ পরিচয়ে। এখন সেগুলো সরাসরি দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হলো।
জাতীয় সংসদের গ্যালারির নামকরণ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি জাতীয় চেতনারও বহিঃপ্রকাশ। যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের নাম সংসদের দেয়ালে উচ্চারিত হওয়া নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সংসদ ভবন এমন একটি স্থান, যেখানে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়, আইন প্রণয়ন হয়, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়। সেই স্থানেই এখন যুক্ত হলো বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের অমর স্মারক।নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্যালারি-৩ এর নাম রাখা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফের নামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় অসীম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি শহীদ হন। তার অবদান আজও জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
গ্যালারি-৪ এর নামকরণ করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের নামে। দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়া এই মহান বীরের নাম সংসদে যুক্ত হওয়ায় জাতীয় মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্যালারি-৫ এর নাম এখন বীরশ্রেষ্ঠ ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন। নৌযুদ্ধে তার আত্মদান দেশের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সংসদের এই নামকরণ তার অবদানকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এলো।গ্যালারি-৬ এর নাম রাখা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের নামে। সীমান্তযুদ্ধে তার সাহসিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা আজও দেশের মানুষের কাছে গর্বের বিষয়।
গ্যালারি-৭ এর নামকরণ করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের নামে। সম্মুখযুদ্ধে অতুলনীয় সাহসিকতা দেখিয়ে তিনি শহীদ হন। জাতীয় সংসদে তার নাম যুক্ত হওয়া জাতির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধার প্রতীক। এছাড়া বিশেষ অতিথিদের জন্য নির্ধারিত ভিআইপি গ্যালারি-১ এর নাম রাখা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নামে। মুক্তিযুদ্ধে তার নেতৃত্ব ও সাহসিকতা দেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। ভিআইপি গ্যালারি-২ এর নাম হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের নামে। অল্প বয়সে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি শহীদ হন। সংসদে তার নাম স্থাপন তরুণদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে বলে মনে করছেন অনেকে।
জাতীয় সংসদের গ্যালারির নামকরণে গ্যালারি-১ ও গ্যালারি-২ সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। ফলে সংবাদকর্মীরা সংসদের কার্যক্রম কভার করার পাশাপাশি প্রতিদিন মুক্তিযুদ্ধের বীরদের নামও দেখতে পাবেন। এটিও প্রতীকী দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু নাম পরিবর্তন নয়, ইতিহাসকে দৃশ্যমান করার একটি শক্তিশালী উদ্যোগ। অনেক সময় প্রজন্ম বদলের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস দূরে সরে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় এভাবে স্মৃতি সংরক্ষণ করলে তা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা। এখানে আগত দেশি-বিদেশি অতিথি, শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ দর্শনার্থীরা এখন বীরশ্রেষ্ঠদের নাম দেখতে পাবেন। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরও বিস্তৃতভাবে পরিচিত হবে। শিক্ষাবিদদের মতে, বইয়ের পাতার বাইরে ইতিহাসকে জীবন্ত রাখার জন্য এ ধরনের উদ্যোগ জরুরি। শুধু দিবস পালন করলেই যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ইতিহাসকে যুক্ত করলে তা আরও কার্যকর হয়। জাতীয় সংসদের গ্যালারির নামকরণ তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল গণতন্ত্র, সাম্য ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। জাতীয় সংসদও গণতন্ত্রের প্রতীক। তাই সংসদ ভবনে বীরশ্রেষ্ঠদের নাম সংযোজনের মধ্যে রয়েছে গভীর তাৎপর্য। এটি স্বাধীনতার আদর্শ ও গণতন্ত্রকে একই সূত্রে বেঁধেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকে। তাদের মতে, দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে বীরশ্রেষ্ঠদের নাম স্থাপন করা হলে জাতি তার শেকড়কে আরও দৃঢ়ভাবে স্মরণ করতে পারে। জাতীয় সংসদের গ্যালারির নামকরণ ভবিষ্যতে আরও বড় সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক উদ্যোগের পথ খুলে দিতে পারে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় মুক্তিযুদ্ধের বীরদের স্মৃতি সংরক্ষণে নতুন ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জাতীয় সংসদের গ্যালারির নামকরণ দেশের ইতিহাসচর্চায় এক স্মরণীয় সংযোজন। সাত বীরশ্রেষ্ঠের নামে গ্যালারি নামকরণ শুধু সম্মান প্রদর্শন নয়, এটি জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও অনন্য দৃষ্টান্ত। যে সংসদে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়, সেই সংসদে এখন প্রতিধ্বনিত হবে মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সন্তানদের নাম। এভাবেই ইতিহাস বেঁচে থাকে, প্রেরণা হয়ে ওঠে, আর জাতিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।



























