সৈয়দ আব্দুল হাদীকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান উপলক্ষে রাজধানীতে এক আবেগঘন ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। বাংলা গানের ইতিহাসে অন্যতম উজ্জ্বল নাম সৈয়দ আব্দুল হাদীকে ঘিরে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠান শুধু একজন শিল্পীকে সম্মান জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও দেশপ্রেমের এক অনন্য বার্তাও তুলে ধরেছে। গত ১২ জুন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘কালজয়ী কণ্ঠ: শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সৈয়দ আব্দুল হাদী’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি অঙ্গনের
বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সংগীতশিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং অসংখ্য দর্শক-শ্রোতা। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এই আয়োজন ছিল স্মৃতিচারণ, সংগীত পরিবেশনা এবং সম্মাননা প্রদানের এক অনন্য সমন্বয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মাওলা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেষ রেজাউদ্দিন আহমেদ। তাঁদের বক্তব্যে সৈয়দ আব্দুল হাদীর দীর্ঘ সংগীতজীবন, অসামান্য অবদান এবং বাংলা গানের বিকাশে তাঁর ভূমিকার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রদর্শিত হয় সৈয়দ আব্দুল হাদীর জীবন, কর্ম এবং সংগীতসাধনার ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র। তথ্যচিত্রে তাঁর সংগীতজীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, জনপ্রিয় গান এবং দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর অবদানের নানা দিক তুলে ধরা হয়। দর্শকরা গভীর আগ্রহ নিয়ে তথ্যচিত্রটি উপভোগ করেন। এরপর অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বে কিংবদন্তি এই শিল্পীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্মারক তুলে দেন প্রধান অতিথি। সম্মাননা গ্রহণের সময় উপস্থিত দর্শকরা দীর্ঘ করতালির মাধ্যমে তাঁদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেন। অনেকের কাছে মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন এবং স্মরণীয়।
সম্মাননা প্রদানের পর শুরু হয় সংগীত পরিবেশনা। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা সৈয়দ আব্দুল হাদীর জনপ্রিয় ও কালজয়ী গান পরিবেশন করেন। এতে অংশ নেন রাশেদ, অপু আমান, আতিক, নোলক, রাফি, স্বরলিপি, রাকা পপি, অনন্যা, স্মরণ, পুষ্পিতা এবং আরও অনেক শিল্পী। তাঁদের পরিবেশনায় উঠে আসে বাংলা গানের স্বর্ণযুগের স্মৃতি। প্রতিটি গান পরিবেশনার সময় দর্শকদের মধ্যে ছিল বিশেষ উচ্ছ্বাস। তরুণ শিল্পীদের কণ্ঠে সৈয়দ আব্দুল হাদীর জনপ্রিয় গান নতুন মাত্রা পায়। একই সঙ্গে দর্শকরা অনুভব করেন বাংলা গানের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই ধারার উত্তরাধিকার বহনের গুরুত্ব।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সমবেত সংগীত ‘আছেন আমার মোক্তার’। গানটি পরিবেশনের সময় পুরো মিলনায়তনে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দর্শক-শ্রোতারা গভীর মনোযোগের সঙ্গে পরিবেশনা উপভোগ করেন এবং শিল্পীদের প্রশংসায় ভাসান। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে পরিবেশিত হয় ‘সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তে তুমি’ গানটি। এ পরিবেশনায় সৈয়দ আব্দুল হাদীর সঙ্গে অংশ নেন লিনু বিল্লাহ, আবিদা সুলতানা, ফেরদৌস আরা এবং রুমানা ইসলাম। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিল্পীরাও তাঁদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। এই সম্মিলিত পরিবেশনা অনুষ্ঠানের সমাপ্তিকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
অনুষ্ঠান শেষে বক্তব্য দিতে গিয়ে সৈয়দ আব্দুল হাদী নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, উপস্থিত সবাই যে ভালোবাসা ও সম্মান দেখিয়েছেন, তাতে তিনি গভীরভাবে অভিভূত। এই আয়োজনের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।তবে শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকেননি এই বরেণ্য শিল্পী। তিনি দেশের মানুষকে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, আমরা যেন নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি না করি। বরং দেশকে ভালোবেসে, দেশের কথা ভেবে এবং দেশের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করি।
সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাইকে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি এবং সম্ভাবনায় ভরপুর দেশ পৃথিবীতে খুব কমই রয়েছে। তাই দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ থেকেই প্রত্যেক নাগরিকের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা। অনুষ্ঠানে যন্ত্রসংগীত পরিবেশনেও ছিলেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পীরা। তবলায় চন্দন দত্ত ও পল্লব স্যানাল, কী-বোর্ডে পার্থ প্রতীতম বাপ্পী ও কাইয়ূম, গিটারে টুটুল, সামু ও রিচার্ড কিশোর, বাঁশিতে মনিরুজ্জামান ও মামুন, বেহালায় সুনীল ও বাদশা, ড্রামসে পুলক, অক্টোপ্যাডে সাকিব, পারকাশনে উজ্জ্বল এবং স্যাক্সোফোনে আব্দুর রব অংশ নেন। তাঁদের দক্ষ পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ করে।
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে সৈয়দ আব্দুল হাদীর অবদান অনস্বীকার্য। কয়েক দশক ধরে তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন, যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে সমানভাবে স্থান করে আছে। তাঁর কণ্ঠ, শিল্পীসত্তা এবং দেশপ্রেমের বার্তা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রীয় এই সম্মাননা শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অর্জনের স্বীকৃতি নয়, বরং বাংলা সংগীতের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিও রাষ্ট্রের সম্মান প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেই সঙ্গে অনুষ্ঠানে উচ্চারিত তাঁর আহ্বান—‘আসুন দেশটার জন্য সবাই মিলে কিছু করি’—নাগরিক দায়িত্ববোধের এক শক্তিশালী বার্তা হয়ে দীর্ঘদিন মানুষের মনে অনুরণিত হবে।




























