একটি কবিতা কীভাবে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে পারে, তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশি শরণার্থীদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করে কবিতাটি লিখেছিলেন মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ। তার এই সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্মৃতি-৭১ আয়োজিত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ স্মারক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো অ্যালেন গিন্সবার্গকে স্মরণ করা হয়। একই সঙ্গে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশি শরণার্থীদের ইতিহাস নিয়ে পৃথক গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বক্তারা।
বক্তারা বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন ও সহিংসতার কারণে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। শরণার্থী শিবিরে মানুষের ক্ষুধা, রোগ, অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকট অ্যালেন গিন্সবার্গকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি রচনা করেন।
কবিতাটিতে শরণার্থীদের দুর্ভোগ ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়। পরবর্তীতে কবিতাটিতে সুরারোপ করে গান তৈরি করা হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। অনুষ্ঠানে কবিতাটির অংশবিশেষ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় আবৃত্তি করেন নাজনিন পাপ্পু ও ফারুক এইচ খান।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ভাস্কর বন্দোপাধ্যায়। তিনি জানান, অপারেশন সার্চলাইটের সময় তিনি খুলনায় ছিলেন। পরে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে ভারতে যাওয়ার পথে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বহু মানুষ হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। শরণার্থী শিবিরে নিজের মাকে হারানোর স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি।
ভাস্কর বন্দোপাধ্যায় বলেন, শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের জীবন, ভারত সরকারের সহযোগিতা এবং সে সময়কার বাস্তবতা নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। জীবিত প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে প্রামাণ্যচিত্র, বই ও কবিতার মতো মাধ্যম ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবির ও ভারতের বিভিন্ন এলাকায় গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহের স্মৃতিচারণ করেন সংগীতশিল্পী শাহিন সামাদ। তিনি কয়েকটি গান পরিবেশন করেন এবং অভিভাবকদের সন্তানদের নিয়ে নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শনের আহ্বান জানান।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন কাজ হলেও শরণার্থীদের ইতিহাস নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। ১৯৭১ সালে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি এই ইতিহাস সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।
অনুষ্ঠানে শঙ্কর লাল সাহা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মিরাজ ফরাজি ও মাহবুব জামান বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জিনাত আরা হক।



























