ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ নতুন এক ইতিহাসের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ের মধ্যকার ম্যাচে প্রথমবারের মতো ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘ভুল পরিচয়’ শনাক্ত করা হয়েছে। এর ফলে মাঠের রেফারি নিজের আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নতুন সিদ্ধান্ত দেন, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে একেবারেই নজিরবিহীন ঘটনা।
শনিবার লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ‘ডি’-এর ম্যাচে ৪-১ গোলের বড় জয় পেয়েছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। তবে ম্যাচের ফলাফলের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ভিএআরের একটি গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ। ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে প্রযুক্তির এমন ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। প্রথমার্ধেই তিন গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় স্বাগতিকরা। প্যারাগুয়ের জন্য তখন ম্যাচে ফেরার সুযোগ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল।
সবকিছু স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে চললেও ম্যাচের ৫৩তম মিনিটে ঘটে বিতর্কিত একটি ঘটনা। প্যারাগুয়ের তারকা খেলোয়াড় মিগুয়েল আলমিরনের বিরুদ্ধে ফাউল করার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার টিম রিমকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি ড্যানি মাকেলি। একই সঙ্গে প্যারাগুয়েকে একটি ফ্রি-কিকও দেওয়া হয়।
রেফারির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্যারাগুয়ে দ্রুত ফ্রি-কিক নিয়ে খেলা চালিয়ে যায়। দর্শক এবং খেলোয়াড়দের কাছে বিষয়টি তখন স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়।
নেদারল্যান্ডসের রেফারি ড্যানি মাকেলি ভিএআর কক্ষ থেকে পাওয়া বার্তার ভিত্তিতে খেলা থামান। এরপর তিনি মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি আবার পর্যবেক্ষণ করেন। ভিডিও ফুটেজ দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে মাঠে দেওয়া তার আগের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না।
ভিএআরের রিপ্লেতে দেখা যায়, টিম রিম আসলে আলমিরনকে স্পর্শই করেননি। অর্থাৎ যে ফাউলের অভিযোগে রিমকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়েছিল, সেই ঘটনাই বাস্তবে ঘটেনি। বরং আলমিরন প্রতিপক্ষের স্পর্শ ছাড়াই পড়ে গিয়ে ফাউলের আবেদন করেছিলেন।
ভিডিও প্রমাণ হাতে পাওয়ার পর রেফারি নিজের সিদ্ধান্ত বদলে দেন। তিনি টিম রিমের হলুদ কার্ড বাতিল করেন এবং উল্টো অভিনয় বা ডাইভিংয়ের দায়ে প্যারাগুয়ের ফরোয়ার্ড মিগুয়েল আলমিরনকে হলুদ কার্ড দেখান। এতে মাঠে উপস্থিত দর্শক এবং টেলিভিশন দর্শকদের মধ্যেও বিস্ময় দেখা দেয়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম ভিএআরের সহায়তায় ‘ভুল পরিচয়’ শনাক্ত করে কার্ড পরিবর্তনের ঘটনা ঘটল। ফুটবলবিশ্বে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে সঠিক বিচার নিশ্চিত করার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
ফিফা এবারের বিশ্বকাপের আগে ভিএআর ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম পরিবর্তন করেছে। এসব পরিবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মাঠের ভুল সিদ্ধান্ত কমিয়ে আনা এবং খেলাটিকে আরও ন্যায়সঙ্গত করা।
রেফারিদের প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনার উদ্যোগেই ‘ভুল পরিচয়’ শনাক্তকরণের নতুন নিয়মটি চালু করা হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো খেলোয়াড়কে ভুলভাবে ফাউলকারী হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে ভিএআরের সাহায্যে সেই সিদ্ধান্ত সংশোধন করা যাবে।
নতুন নিয়মের আওতায় শুধু ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার ঘটনাই নয়, নির্দিষ্ট কিছু কার্ড-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করা সম্ভব হবে। তবে এর ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ফিফার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের কারণে লাল কার্ড দেখানোর সিদ্ধান্ত ভিএআরের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা যাবে। কিন্তু প্রথম হলুদ কার্ড সাধারণত ভিএআরের আওতায় পড়ে না। যুক্তরাষ্ট্র-প্যারাগুয়ে ম্যাচে ব্যতিক্রম ঘটেছে শুধুমাত্র ‘ভুল পরিচয়’ সংক্রান্ত নতুন নিয়মের কারণে।
তবে এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে ফ্রি-কিক নেওয়ার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিষয়টি। সাধারণত খেলা পুনরায় শুরু হয়ে গেলে আগের ঘটনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ খুব সীমিত থাকে। তাই অনেক দর্শক শুরুতে বিষয়টি বুঝতে পারেননি।
ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, নিয়মের ব্যাখ্যা আরও পরিষ্কারভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতেও এমন পরিস্থিতিতে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
বিবিসি স্পোর্টসকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এভারটন ও ওয়েলসের সাবেক ডিফেন্ডার অ্যাশলি উইলিয়ামস বলেন, ফ্রি-কিক নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাটা কিছুটা অদ্ভুত মনে হলেও শেষ পর্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে। তার মতে, এমন উদ্যোগ খেলার স্বচ্ছতা বাড়াবে।
সাবেক ইংল্যান্ড মিডফিল্ডার ড্যানি মারফিও নতুন নিয়মকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ডাইভিং বা অভিনয়ের মতো আচরণকে শাস্তিযোগ্য করার যেকোনো উদ্যোগ ফুটবলের জন্য ইতিবাচক। এতে খেলোয়াড়রা প্রতারণামূলক কৌশল ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবে।
ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। কেউ মনে করেন ভিএআর খেলাটিকে আরও ন্যায়সংগত করছে, আবার কেউ মনে করেন এতে খেলার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ের ম্যাচে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা প্রযুক্তির ইতিবাচক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে একটি ভুল সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফল ও টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিতে পারে। সেই জায়গা থেকে বিচার করলে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে ভিএআরের এমন ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শুরুতেই প্রযুক্তিনির্ভর এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ফুটবলপ্রেমীদের নতুন আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে যে, ফুটবলের আধুনিক যুগে প্রযুক্তি শুধু সহায়ক নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।




























