ঘরের মাঠে ৩২ বছর পর বিশ্বকাপ খেলতে নেমে ইতিহাস গড়া জয় দিয়ে অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ডি’ গ্রুপের ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে স্বাগতিকরা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ম্যাচে চার গোল করার কৃতিত্ব দেখাল যুক্তরাষ্ট্র।
লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে মরিসিও পচেত্তিনোর শিষ্যরা। গ্যালারিভর্তি দর্শকদের সমর্থন পেয়ে তারা একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগকে চাপে রাখে। ম্যাচজুড়ে তাদের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
পরিসংখ্যানও যুক্তরাষ্ট্রের দাপটের প্রমাণ দিয়েছে। পুরো ম্যাচে ৬৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল তারা। এছাড়া ১৬টি শটের মধ্যে ছয়টি ছিল লক্ষ্যে, যেখানে প্যারাগুয়ে মাত্র একটি শট অন টার্গেট রাখতে সক্ষম হয়।
ম্যাচের মাত্র সপ্তম মিনিটেই এগিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। মাঝমাঠ থেকে দুর্দান্ত দৌড়ে আক্রমণ সাজান ওয়েস্টন ম্যাককেনি। এরপর ক্রিস্টিয়ান পুলিসিকের সঙ্গে চমৎকার বোঝাপড়ায় তৈরি হওয়া আক্রমণ শেষ পর্যন্ত প্যারাগুয়ের আত্মঘাতী গোলে পরিণত হয়।
ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের উদ্দেশে বাড়ানো বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই পাঠিয়ে দেন প্যারাগুয়ের ডিফেন্ডার ডামিয়ান বোবাদিলা। তাতেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। গ্যালারিতে তখন উৎসবের আমেজ।
এই গোলের মাধ্যমে একটি নতুন ইতিহাসও গড়ে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশের প্রথম ম্যাচে এটি তৃতীয় দ্রুততম গোল হিসেবে রেকর্ডবুকে জায়গা করে নেয়। এর আগে ১৯৩৮ সালে ফ্রান্স এবং ২০০৬ সালে জার্মানি আরও দ্রুত গোল করেছিল।
গোল হজম করার পর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে প্যারাগুয়ে। ১৪ মিনিটে হুলিও এনসিসো দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে ডি-বক্সে ঢুকে নেওয়া তাঁর শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে সমতায় ফেরার সুযোগ হাতছাড়া হয়।
২৮ মিনিটে আবারও গোলের দেখা পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। টাইলার অ্যাডামসের দারুণ পাস থেকে বল জালে জড়ান ফোলারিন বালোগুন। কিন্তু আক্রমণের শুরুতে পুলিসিক অফসাইডে থাকায় ভিএআর পর্যালোচনার পর গোলটি বাতিল করা হয়।
তবে সেই হতাশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ম্যাচের ৩২ মিনিটে আবারও আক্রমণে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্র। বক্সের বাইরে থেকে পাওয়া সুযোগে নিখুঁত ফিনিশিং করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন বালোগুন।
গোল পাওয়ার পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে স্বাগতিকরা। প্যারাগুয়ের ডিফেন্স বারবার চাপে পড়ে। দ্রুতগতির আক্রমণ আর সঠিক পাসিংয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আবারও আঘাত হানেন বালোগুন। মালিক টিলম্যানের নিখুঁত পাস ধরে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন তিনি। নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করে দলকে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড।
প্রথমার্ধের খেলা শেষ হওয়ার আগেই কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। তিন গোলের লিড নিয়ে বিরতিতে যায় যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের মধ্যে তখন হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য হাল ছাড়েনি প্যারাগুয়ে। তারা আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায় এবং মাঝমাঠে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এর ফলে ম্যাচে কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ফিরে আসে।
৭৩ মিনিটে সেই চেষ্টার ফল পায় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। হুলিও এনসিসোর পাস থেকে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে ব্যবধান কমান মাউরিসিও। তাতে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩-১।
গোল করার পর আরও একটি গোলের খোঁজে মরিয়া হয়ে ওঠে প্যারাগুয়ে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগ সুশৃঙ্খল ফুটবল খেলে তাদের বেশিরভাগ আক্রমণই প্রতিহত করে দেয়। ফলে ম্যাচে ফেরার স্বপ্ন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়।
ম্যাচের ৮৯ মিনিটে বড় একটি সুযোগ নষ্ট করে যুক্তরাষ্ট্র। ম্যাককেনির চমৎকার পাস থেকে ফাঁকা পোস্ট পেয়েও বল ক্রসবারের ওপর দিয়ে মেরে বসেন রিকার্ডো পেপি। এতে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত গোলের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়নি। নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে দুর্দান্ত দলীয় আক্রমণ থেকে বল পান জিওভানি রেইনা। এরপর বাঁকানো নিখুঁত শটে প্যারাগুয়ের জালে বল জড়িয়ে দেন তিনি।
রেইনার সেই গোলের মধ্য দিয়েই ৪-১ ব্যবধানের বড় জয় নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে এমন দাপুটে পারফরম্যান্সে স্বাগতিকদের শিরোপা স্বপ্ন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে প্যারাগুয়ের জন্য এটি ছিল হতাশাজনক শুরু। রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং আক্রমণে কার্যকারিতার অভাব তাদের ভুগিয়েছে পুরো ম্যাচজুড়ে। পরবর্তী ম্যাচগুলোতে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে তাদের জন্য নকআউট পর্বের পথ কঠিন হয়ে যাবে।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই ইতিহাস গড়ে যুক্তরাষ্ট্র শুধু তিন পয়েন্টই অর্জন করেনি, নিজেদের সামর্থ্যেরও শক্ত বার্তা দিয়েছে। ঘরের দর্শকদের সামনে এমন দুর্দান্ত জয়ে টুর্নামেন্টের শুরুতেই অন্যতম আলোচিত দলে পরিণত হয়েছে তারা।























