ঢাকা ১০:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নজরুলের বরিশাল: হারিয়ে যাওয়া ভেনিসের মুগ্ধকর ইতিহাস

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৮:১৫:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫১৪

কীর্তনখোলার তীরের বরিশাল শহর | ছবি: সংগৃহীত

নজরুলের বরিশাল একসময় ছিল জল, সবুজ আর লাল সুরকির রাস্তার অপূর্ব এক শহর। কীর্তনখোলার তীরে গড়ে ওঠা এই নগরীর সৌন্দর্য মুগ্ধ করেছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। জীবদ্দশায় একাধিকবার বরিশালে এসে তিনি দেখেছিলেন শহরের বুক চিরে বয়ে চলা অসংখ্য খাল, সারি সারি ঝাউ ও পামগাছ, নদীর তীরের পথ এবং শান্ত সবুজ গ্রাম। সেই সময়ের বরিশালকে কবি ভালোবেসে তুলনা করেছিলেন ভেনিসের সঙ্গে। তাঁর চোখে শহরটি ছিল প্রকৃতি, নদী আর মানুষের জীবনের এক অনন্য মিলনস্থল।

নজরুলের বরিশাল-স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও। ১৯২০ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে তিনি প্রথমবার বরিশালে আসেন বলে গবেষকদের বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন সভায় তিনি দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। পরবর্তী সময়েও বরিশালে তাঁর আসার তথ্য পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, বরিশালের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেই অভিজ্ঞতার সাহিত্যিক প্রতিফলনও নজরুলের লেখায় খুঁজে পাওয়া যায়।

একসময় বরিশাল শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতো প্রায় ২৪টি খাল। এসব খাল ছিল শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়, বরং শহরের যোগাযোগব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ছোট-বড় নৌকায় চলত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। পানির ওপর দাঁড়-বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের ভাটিয়ালি গান আর খালের দুই পাশের সবুজ প্রকৃতি শহরটিকে দিয়েছিল স্বতন্ত্র আবহ। নজরুলের বরিশাল তাই কেবল একটি শহরের নাম ছিল না; এটি ছিল নদী-খাল, মানুষ ও প্রকৃতির মিলিত এক জীবন্ত ছবি।

কালের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য অনেকটাই মুছে গেছে। নগরায়ণ ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহু খাল হারিয়ে গেছে। কোথাও খাল ভরাট করে তৈরি হয়েছে রাস্তা, কোথাও আবার পুরোনো জলপথ পরিণত হয়েছে সরু ড্রেনে। আবর্জনা ও দখলের কারণে অবশিষ্ট জলপথগুলোর অবস্থাও অনেক জায়গায় সংকটপূর্ণ। যে শহরের সৌন্দর্য একসময় কবির কল্পনাকে আলোড়িত করেছিল, সেখানে আজ ইট-পাথর আর কংক্রিটের আধিপত্য। হারিয়ে গেছে বহু পুরোনো ঝাউ ও পামগাছের সারিও।

তবু পুরোপুরি মুছে যায়নি নজরুলের বরিশাল। শহরের কিছু পুরোনো স্থাপনা, গির্জা, কীর্তনখোলার তীর এবং সদর হাসপাতাল এলাকার পুরোনো গাছপালা এখনো অতীতের গল্প মনে করিয়ে দেয়। গবেষকদের মতে, শহরের প্রবেশপথের কাছাকাছি থাকা কয়েকটি ঐতিহাসিক গির্জাও কবির সময়ের বরিশালের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এসব স্থাপনার সঙ্গে নজরুলের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একইভাবে শেরেবাংলার পুরোনো বাড়িসহ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ রয়েছে।

নজরুলের বরিশাল আজ তাই এক হারিয়ে যাওয়া শহরের গল্প, আবার একই সঙ্গে ফিরে দেখার একটি সুযোগ। যে শহর কবির চোখে ছিল বাংলার ভেনিস, সেই শহরের খাল, গাছপালা, নদীর তীর ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—এগুলো বরিশালের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো চিহ্নিত ও সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম ইতিহাসের সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হতে পারে। কীর্তনখোলার বাতাসে আজও হয়তো সেই পুরোনো শহরের কিছুটা আবেশ রয়ে গেছে; প্রয়োজন শুধু সেটিকে নতুন করে খুঁজে দেখার।

জনপ্রিয় সংবাদ

নজরুলের বরিশাল: হারিয়ে যাওয়া ভেনিসের মুগ্ধকর ইতিহাস

Update Time : ০৮:১৫:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নজরুলের বরিশাল একসময় ছিল জল, সবুজ আর লাল সুরকির রাস্তার অপূর্ব এক শহর। কীর্তনখোলার তীরে গড়ে ওঠা এই নগরীর সৌন্দর্য মুগ্ধ করেছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। জীবদ্দশায় একাধিকবার বরিশালে এসে তিনি দেখেছিলেন শহরের বুক চিরে বয়ে চলা অসংখ্য খাল, সারি সারি ঝাউ ও পামগাছ, নদীর তীরের পথ এবং শান্ত সবুজ গ্রাম। সেই সময়ের বরিশালকে কবি ভালোবেসে তুলনা করেছিলেন ভেনিসের সঙ্গে। তাঁর চোখে শহরটি ছিল প্রকৃতি, নদী আর মানুষের জীবনের এক অনন্য মিলনস্থল।

নজরুলের বরিশাল-স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও। ১৯২০ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে তিনি প্রথমবার বরিশালে আসেন বলে গবেষকদের বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন সভায় তিনি দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। পরবর্তী সময়েও বরিশালে তাঁর আসার তথ্য পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, বরিশালের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেই অভিজ্ঞতার সাহিত্যিক প্রতিফলনও নজরুলের লেখায় খুঁজে পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন  দেশকে অস্থিতিশীল করতে গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলে বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

একসময় বরিশাল শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতো প্রায় ২৪টি খাল। এসব খাল ছিল শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়, বরং শহরের যোগাযোগব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ছোট-বড় নৌকায় চলত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। পানির ওপর দাঁড়-বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের ভাটিয়ালি গান আর খালের দুই পাশের সবুজ প্রকৃতি শহরটিকে দিয়েছিল স্বতন্ত্র আবহ। নজরুলের বরিশাল তাই কেবল একটি শহরের নাম ছিল না; এটি ছিল নদী-খাল, মানুষ ও প্রকৃতির মিলিত এক জীবন্ত ছবি।

আরও পড়ুন  ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের আকাশে যেসব মহাজাগতিক দৃশ্য ঘটবে

কালের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য অনেকটাই মুছে গেছে। নগরায়ণ ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহু খাল হারিয়ে গেছে। কোথাও খাল ভরাট করে তৈরি হয়েছে রাস্তা, কোথাও আবার পুরোনো জলপথ পরিণত হয়েছে সরু ড্রেনে। আবর্জনা ও দখলের কারণে অবশিষ্ট জলপথগুলোর অবস্থাও অনেক জায়গায় সংকটপূর্ণ। যে শহরের সৌন্দর্য একসময় কবির কল্পনাকে আলোড়িত করেছিল, সেখানে আজ ইট-পাথর আর কংক্রিটের আধিপত্য। হারিয়ে গেছে বহু পুরোনো ঝাউ ও পামগাছের সারিও।

তবু পুরোপুরি মুছে যায়নি নজরুলের বরিশাল। শহরের কিছু পুরোনো স্থাপনা, গির্জা, কীর্তনখোলার তীর এবং সদর হাসপাতাল এলাকার পুরোনো গাছপালা এখনো অতীতের গল্প মনে করিয়ে দেয়। গবেষকদের মতে, শহরের প্রবেশপথের কাছাকাছি থাকা কয়েকটি ঐতিহাসিক গির্জাও কবির সময়ের বরিশালের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এসব স্থাপনার সঙ্গে নজরুলের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একইভাবে শেরেবাংলার পুরোনো বাড়িসহ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন  লিভার নষ্ট হওয়ার আগেই শরীর যে ১০ সংকেত দেয়

নজরুলের বরিশাল আজ তাই এক হারিয়ে যাওয়া শহরের গল্প, আবার একই সঙ্গে ফিরে দেখার একটি সুযোগ। যে শহর কবির চোখে ছিল বাংলার ভেনিস, সেই শহরের খাল, গাছপালা, নদীর তীর ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—এগুলো বরিশালের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো চিহ্নিত ও সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম ইতিহাসের সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হতে পারে। কীর্তনখোলার বাতাসে আজও হয়তো সেই পুরোনো শহরের কিছুটা আবেশ রয়ে গেছে; প্রয়োজন শুধু সেটিকে নতুন করে খুঁজে দেখার।