ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেল উদ্ভাবন করে আলোচনায় এসেছেন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার তরুণ রতন মহন্ত। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও পাম্পে দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তির সময়ে তার এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। তিনি নিজের পুরোনো পেট্রোলচালিত মোটরসাইকেলকে পরিবর্তন করে একটি ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেলে রূপান্তর করেছেন, যা এখন নিয়মিত চলাচলের জন্য ব্যবহার করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাণীশংকৈল পৌর শহরের মহলবাড়ী এলাকার বাসিন্দা রতন মহন্ত পেশায় একজন অটোভ্যান মেকানিক। সীমিত আয়ের মধ্যেও নতুন কিছু করার ইচ্ছা থেকেই তিনি ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেল উদ্ভাবনের পরিকল্পনা করেন। তার এই উদ্যোগ এখন এলাকায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
২০১৯ সালে তিনি একটি পুরোনো ১০০ সিসি মোটরসাইকেল কিনেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন ব্যবহারের পর যান্ত্রিক ত্রুটি ও জ্বালানি ব্যয়ের কারণে সেটি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন তিনি পেট্রোলচালিত ইঞ্জিন খুলে ফেলে নতুনভাবে মোটর ও ব্যাটারি সংযোজন করে ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনি মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের জায়গায় অটোরিকশার মোটর বসান এবং শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন ১২ ভোল্টের চারটি ব্যাটারি। এভাবে তৈরি হওয়া ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেল এখন একবার চার্জ দিলে প্রায় ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।
রতন মহন্ত জানান, এই মোটরসাইকেল চালাতে বিদ্যুৎ খরচ হয় খুবই কম। একবার চার্জ দিতে প্রায় ৫ টাকার মতো বিদ্যুৎ খরচ হয়। একই দূরত্ব পেট্রোলচালিত বাইকে চলতে গেলে যেখানে কয়েকশ টাকা খরচ হয়, সেখানে তার তৈরি ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেল অনেক সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। প্রথমদিকে অনেকেই তার এই পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেননি। কেউ কেউ এটিকে অসম্ভব বলেও মন্তব্য করেছিলেন। তবে তিনি নিজের চেষ্টা থামাননি এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করে ধীরে ধীরে কাজটি সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে স্থানীয় অনেক মানুষ তার এই উদ্যোগের প্রশংসা করছেন। অনেকেই নিজেদের মোটরসাইকেলকেও ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেলে রূপান্তর করার বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলছেন। এতে করে এলাকায় বিকল্প জ্বালানি প্রযুক্তি নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, যদি এই ধরনের প্রযুক্তি আরও উন্নত করা যায়, তাহলে জ্বালানি খরচ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাও গড়ে উঠতে পারে। কারণ ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেল ব্যবহার করলে ধোঁয়া বা দূষণ কম হয়। রাণীশংকৈল উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম বলেছেন, স্থানীয় পর্যায়ে এমন উদ্ভাবনী উদ্যোগ দেশের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার দিকটি তুলে ধরে। ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগকে উৎসাহিত করার বিষয়ে প্রশাসন গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সম্ভাবনা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে ইলেকট্রিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়লে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। গ্রামীণ পর্যায়ের এই ধরনের উদ্ভাবন প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। স্থানীয় মেকানিক ও উদ্ভাবকদের সহায়তা দিলে তারা আরও উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করতে সক্ষম হতে পারেন।
রতন মহন্তের তৈরি ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেল এখন অনেকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অনেকেই এটি কাছ থেকে দেখতে আসছেন এবং এর কার্যকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইছেন। যদি এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে তা জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


























