২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছে সহ-আয়োজক মেক্সিকো। ঘোষিত দলে জায়গা পেয়েছেন অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গুইলের্মে ওচোয়া, যিনি ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হয়ে ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক গড়তে চলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের এক বিরল রেকর্ডে নাম লেখাতে যাচ্ছেন।
বিশ্ব ফুটবলে গুইলের্মে ওচোয়া এক অনন্য চরিত্র। ক্লাব ফুটবলে সবসময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও বিশ্বকাপ এলেই যেন ভিন্ন এক রূপে হাজির হন তিনি। অসাধারণ সব সেভ এবং দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি বহুবার মেক্সিকোর ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
সোমবার (১ জুন) মেক্সিকোর প্রধান কোচ হাভিয়ের আগুইরে বিশ্বকাপের জন্য চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করেন। সেই দলে জায়গা পেয়েই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন ৪০ বছর বয়সী ওচোয়া। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে প্রথমবার মেক্সিকোর স্কোয়াডে ছিলেন তিনি। এরপর প্রতিটি বিশ্বকাপেই দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে ছয়টি আসরের স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং গুইলের্মে ওচোয়া—এই তিনজনই ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন। ফুটবল ইতিহাসে এর আগে কোনো খেলোয়াড় এই কীর্তি গড়তে পারেননি।
তবে মেসি ও রোনালদো যেখানে নিজ নিজ দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে ওচোয়ার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি মেক্সিকোর প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক নন। ফলে আসন্ন বিশ্বকাপে তার খেলার সময় সীমিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারপরও তার অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্ব দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মেক্সিকোর স্কোয়াডে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের দারুণ সমন্বয় দেখা গেছে। আক্রমণভাগে রয়েছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ফুলহ্যামের অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রাউল হিমিনেজ। পাশাপাশি ইতালিয়ান ক্লাব এসি মিলানের হয়ে খেলা সান্তিয়াগো হিমিনেজও রয়েছেন দলে, যাকে ভবিষ্যতের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দলে জায়গা পেয়েছেন স্পেনে জন্ম নেওয়া মিডফিল্ডার আলভারো ফিদালগো। দীর্ঘদিন ধরে মেক্সিকান ফুটবলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়া এই ফুটবলার এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ স্কোয়াডে সুযোগ পেয়েছেন। তার সৃজনশীলতা ও পাসিং দক্ষতা মিডফিল্ডে বাড়তি শক্তি যোগ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া ফরোয়ার্ড হুলিয়ান কুইনোনেসও আছেন ঘোষিত দলে। মেক্সিকোর নাগরিকত্ব পাওয়ার পর জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলছেন তিনি। গত কয়েক বছরে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স কোচের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
স্কোয়াডের সবচেয়ে বড় চমক ১৭ বছর বয়সী মিডফিল্ডার গিলবার্তো মোরা। তরুণ এই ফুটবলারকে ভবিষ্যতের তারকা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার মাধ্যমে তিনি মেক্সিকোর ইতিহাসে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হতে যাচ্ছেন।
মেক্সিকোর কোচ হাভিয়ের আগুইরের জন্যও এটি একটি বিশেষ বিশ্বকাপ। তৃতীয়বারের মতো তিনি বিশ্বকাপে মেক্সিকোর দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন। এর আগে ২০০২ এবং ২০১০ সালে তার অধীনেই বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল মেক্সিকো।
আগুইরের নেতৃত্বে দুইবারই মেক্সিকো গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল। এবারও তার ওপর বড় প্রত্যাশা রয়েছে। বিশেষ করে সহ-আয়োজক দেশ হিসেবে নিজেদের মাটিতে ভালো কিছু করার সুযোগ রয়েছে দলটির সামনে।
বিশ্বকাপে মেক্সিকোর সর্বোচ্চ সাফল্য কোয়ার্টার ফাইনাল। ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালে নিজেদের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপে শেষ আটে উঠেছিল তারা। এবারও সেই সাফল্য ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে দেশটির ফুটবল সমর্থকরা।
গ্রুপ ‘এ’-তে খেলবে মেক্সিকো। তাদের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্র। তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ এই গ্রুপে মেক্সিকোকে অন্যতম ফেবারিট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আগামী ১১ জুন ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে মেক্সিকো। নিজেদের দর্শকদের সামনে টুর্নামেন্ট শুরু করার সুযোগ নিঃসন্দেহে দলটির জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে ১৯ জুন দক্ষিণ কোরিয়ার মুখোমুখি হবে তারা। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি মেক্সিকোর জন্য কঠিন পরীক্ষা হতে পারে।
এরপর ২৫ জুন গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে মাঠে নামবে মেক্সিকো। নকআউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে এই ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মেক্সিকোর গোলরক্ষক বিভাগে রয়েছেন রাউল র্যাঙ্গেল, গুইলের্মে ওচোয়া এবং কার্লোস আসেভেদো। অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে এই বিভাগ।
রক্ষণভাগে আছেন ইসরায়েল রেইয়েস, হোর্হে সানচেজ, সিজার মন্তেস, ইয়োহান ভাসকেজ, হেসুস গালার্দো এবং মাতেও শাভেজ। ইউরোপ ও দেশীয় লিগে খেলা এই ফুটবলারদের ওপরই নির্ভর করবে দলের ডিফেন্স।
মিডফিল্ডে নেতৃত্ব দেবেন ওয়েস্ট হ্যামের এডসন আলভারেজ। তার সঙ্গে রয়েছেন লুইস রোমো, ওবেদ ভার্গাস, ব্রায়ান গুতিয়েরেজ, ওরবেলিন পিয়েন্দা, এরিক লিরা, গিলবার্তো মোরা, সিজার ওয়েয়াতা, আলভারো ফিদালগো এবং লুইস শাভেজ।
আক্রমণভাগে রয়েছেন রবার্তো আলভারাদো, আলেক্সিস ভেগা, হুলিয়ান কুইনোনেস, সান্তিয়াগো হিমিনেজ, গুইলের্মো মার্তিনেজ, আরমান্দো গঞ্জালেস এবং রাউল হিমিনেজ। গোল করার দায়িত্ব মূলত এই খেলোয়াড়দের কাঁধেই থাকবে।
অভিজ্ঞতা, প্রতিভা এবং স্বাগতিক সুবিধা—সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকোকে ঘিরে আশাবাদী সমর্থকরা। তবে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গুইলের্মে ওচোয়া। বিশ্বকাপ এলেই যিনি নতুন করে আলোচনায় আসেন, সেই কিংবদন্তি গোলরক্ষক এবার ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম আরও গভীরভাবে লিখতে প্রস্তুত।

























