আসন্ন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনল ফিফা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দর্শকরা আর কোনো ধরনের পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে পারবেন না। এর ফলে আগে অনুমোদিত থাকা খালি প্লাস্টিকের বোতল বহনের সুযোগও বাতিল হয়ে গেল।
ফিফা সম্প্রতি তাদের বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্টেডিয়াম আচরণবিধি বা কোড অব কন্ডাক্ট হালনাগাদ করেছে। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল এখন আর অনুমোদিত সামগ্রীর তালিকায় নেই। এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে ফুটবলপ্রেমী ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে আলোচনা তৈরি করেছে।
মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও ফিফার প্রকাশিত নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, দর্শকরা সর্বোচ্চ এক লিটার ধারণক্ষমতার খালি, স্বচ্ছ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতে পারবেন। সেই নীতিমালার ভিত্তিতে অনেকে ধরে নিয়েছিলেন, বিশ্বকাপে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হবে।
তবে নতুন সিদ্ধান্তে আগের সেই অনুমোদন পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে দর্শকদের এখন আর খালি বোতল নিয়ে এসে স্টেডিয়ামের ভেতরে থাকা পানির ফোয়ারা বা ডিসপেনসার থেকে পানি ভরে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এতে দর্শকদের অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
ব্রিটিশ ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’ জানিয়েছে, ফিফা বিশ্বকাপের টিকিটধারীদের কাছে নতুন নীতিমালা সম্পর্কে বার্তা পাঠিয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে যে, নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত বিবেচনায় আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সব সময়ই আয়োজকদের অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়। স্টেডিয়ামে কী আনা যাবে এবং কী আনা যাবে না, তা নিয়ে ফিফা সাধারণত কঠোর অবস্থান নেয়। নতুন সিদ্ধান্তটিও সেই নিরাপত্তা নীতির অংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি ফিফা। ফলে সমর্থকদের একটি বড় অংশ জানতে চাইছেন, কেন এত অল্প সময়ের মধ্যে পূর্বঘোষিত নীতিমালা পরিবর্তন করা হলো। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা চলছে।
বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর অনেক স্টেডিয়ামে আগে থেকেই কঠোর নিরাপত্তা বিধান রয়েছে। বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্টে দর্শকদের বহন করা সামগ্রী সীমিত করার নজিরও রয়েছে। ফিফার নতুন সিদ্ধান্ত সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য বোতল নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর উদ্বেগও বাড়তে পারে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ক্রীড়া আসরে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক আয়োজনেই দর্শকদের নিজস্ব বোতল ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়েছিল।
বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। সেই প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপের মতো বৃহৎ আয়োজন থেকে পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন অনেকে। ফলে নতুন সিদ্ধান্তটি পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে ফিফা তাদের বর্তমান নীতিতে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড় রেখেছে। শিশুখাদ্য প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজনীয় পানি বহন করা যাবে। এছাড়া জীবাণুমুক্ত পানি বা চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনীয় তরল বহনের ক্ষেত্রেও অনুমতি দেওয়া হবে।
তবে এসব ক্ষেত্রে দর্শকদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে। চিকিৎসাজনিত কারণে কোনো তরল বহন করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চিকিৎসা সনদ দেখাতে হবে। সেই সনদ ইংরেজি, ফরাসি অথবা স্প্যানিশ ভাষায় হতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই শর্ত অনেক আন্তর্জাতিক দর্শকের জন্য বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের নিয়মিত ওষুধ বা বিশেষ স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন রয়েছে, তাদের আগে থেকেই প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে। অন্যথায় স্টেডিয়ামে প্রবেশের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্বকাপে লাখো দর্শক উপস্থিত থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনটি দেশে ছড়িয়ে থাকা একাধিক ভেন্যুতে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং প্রবেশ প্রক্রিয়া সহজ রাখতে আয়োজকরা বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করছে।
বিশ্বকাপে দর্শকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। ফিফা সম্ভবত এই দুই বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে। তবে নতুন সিদ্ধান্ত দর্শকদের কতটা সন্তুষ্ট করতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ক্রীড়া আসরে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় অনেক সময় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে দর্শকদের সুবিধা ও পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তাই ফিফার উচিত সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
অনেক সমর্থক মনে করছেন, যদি বোতল বহনের অনুমতি না-ই দেওয়া হয়, তাহলে স্টেডিয়ামের ভেতরে পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় স্টেডিয়ামে অবস্থান করা দর্শকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২৬ বিশ্বকাপ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হবে। কিছু অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেশ বেশি থাকে। তাই পর্যাপ্ত পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা দর্শকদের স্বাস্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ফিফা নিয়মিত বিভিন্ন নীতিমালা পর্যালোচনা করছে। টিকিট ব্যবস্থা, নিরাপত্তা প্রটোকল, স্টেডিয়াম পরিচালনা এবং দর্শকসেবার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পানির বোতল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
আগামী মাসগুলোতে ফিফা আরও কিছু নির্দেশনা হালনাগাদ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই বিশ্বকাপে অংশ নিতে ইচ্ছুক দর্শকদের নিয়মিত অফিসিয়াল নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে ভেন্যুতে প্রবেশের সময় কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না।
বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরগুলোর একটি। তাই আয়োজকদের প্রতিটি সিদ্ধান্তই বৈশ্বিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। পানির বোতল নিষিদ্ধ করার এই সিদ্ধান্তও ব্যতিক্রম নয়।
এখন দেখার বিষয়, সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া এবং বিভিন্ন পক্ষের মতামতের পর ফিফা ভবিষ্যতে এই নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনে কি না। তবে আপাতত নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ২০২৬ বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামে দর্শকদের আর নিজেদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল নিয়ে প্রবেশের সুযোগ থাকছে না।
























