উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে শুরু হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং ব্যয়বহুল ফুটবল বিশ্বকাপ। ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে আয়োজক দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক উৎপাদন প্রায় ৮ হাজার ১০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। টুর্নামেন্টটি শুধু ফুটবলের উৎসব নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম বড় ইভেন্ট হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
যদিও এই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার হিসাব নিয়ে কিছু স্বাধীন অর্থনীতিবিদ প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, কাগজে-কলমে দেখানো সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাস্তবে পুরোপুরি অর্জিত নাও হতে পারে। তবুও আয়োজক দেশগুলো আশা করছে বিশ্বকাপ তাদের পর্যটন, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আগামী ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচের মাধ্যমে পর্দা উঠবে বিশ্বকাপের। এরপর ছয় সপ্তাহজুড়ে চলবে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর। ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই মহাযজ্ঞ।
এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করছে। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে চালু থাকা ৩২ দলের ফরম্যাটকে বিদায় জানিয়ে প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ। ফলে বিশ্বকাপের পরিধি ও বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্ব দুই-ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
দল সংখ্যা বাড়ার ফলে ম্যাচের সংখ্যাও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে একটি বিশ্বকাপে ৬৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো, এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪টিতে। এর ফলে সম্প্রচার, স্পনসরশিপ এবং দর্শক আগ্রহ থেকে আয়ও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী ৪৮টি দলকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে থাকবে চারটি করে দল। গ্রুপ পর্ব শেষে নকআউট পর্যায়ে উঠবে আরও বেশি দল, যা বিশ্বকাপকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে ‘রাউন্ড অব ৩২’ বা শেষ ৩২-এর পর্ব। এর মাধ্যমে নকআউট ধাপে আরও বেশি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে দর্শকরাও তাদের প্রিয় দলকে দীর্ঘ সময় ধরে টুর্নামেন্টে দেখার সুযোগ পাবেন।
এই সম্প্রসারিত ফরম্যাটের সবচেয়ে বড় সুবিধা পেয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা এবং কনকাকাফ অঞ্চলের দেশগুলো। অতীতে যেসব দেশের জন্য বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া কঠিন ছিল, এবার তারা তুলনামূলক সহজে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। ফলে বিশ্ব ফুটবলের ভৌগোলিক বিস্তার আরও বড় হয়েছে।
ফিফা অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে ফুটবলের বিশ্বায়নের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, এর পেছনে বাণিজ্যিক স্বার্থও বড় ভূমিকা রেখেছে। বেশি ম্যাচ মানেই বেশি বিজ্ঞাপন, বেশি দর্শক এবং বেশি সম্প্রচার আয়।
২০২৩ থেকে ২০২৬ মেয়াদে ফিফার মোট রাজস্ব ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বড় অংশই আসবে বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট আয় থেকে। ইতিহাসে আর কোনো বিশ্বকাপকে ঘিরে এত বড় আর্থিক প্রত্যাশা দেখা যায়নি।
বিশ্বকাপের সঙ্গে বাড়ছে দলগুলোর জন্য বরাদ্দ প্রাইজমানিও। এবারের টুর্নামেন্টে পারফরম্যান্সভিত্তিক পুরস্কার তহবিল ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি করে ৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রাইজমানি।
অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দেশের প্রত্যেককে প্রস্তুতি ব্যয় হিসেবে দেওয়া হবে ১৫ লাখ ডলার। টুর্নামেন্টে মাঠে নামার আগেই এই অর্থ পাবে দলগুলো। ছোট ও মধ্যম সারির ফুটবল ফেডারেশনগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুধু অংশগ্রহণ করলেও দলগুলো উল্লেখযোগ্য অর্থ পাবে। কোনো দল যদি একটি ম্যাচও জিততে না পারে এবং দ্রুত বিদায় নেয়, তবুও তাদের জন্য নিশ্চিত থাকবে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ফলে আর্থিকভাবে কোনো দলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন দল পাবে রেকর্ড ৫ কোটি ডলার। ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপ জয়ী কোনো দল এর আগে এত বড় অঙ্কের অর্থ পুরস্কার হিসেবে পায়নি। ফলে ট্রফির পাশাপাশি আর্থিক পুরস্কারও এবার বিশেষ আলোচনায় রয়েছে।
রানার্সআপ দল ঘরে তুলবে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল পাবে ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং চতুর্থ স্থান অধিকারী দল পাবে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। শীর্ষ চার দলের জন্য পুরস্কারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানো দলগুলোও পাবে ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার করে। অন্যদিকে নতুন যুক্ত হওয়া রাউন্ড অব ৩২ থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলোর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ডলার। এতে প্রতিটি ধাপে ভালো করার জন্য আর্থিক প্রণোদনা বাড়ছে।
গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলোর জন্যও থাকছে ৯০ লাখ ডলার পুরস্কার। ফলে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ এখন শুধু মর্যাদার বিষয় নয়, আর্থিকভাবেও অত্যন্ত লাভজনক হয়ে উঠেছে। অনেক দেশের ফুটবল উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে টিকিটের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এবার প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে ডাইনামিক প্রাইসিং মডেল ব্যবহার করা হচ্ছে। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিটের মূল্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে সস্তা টিকিটের মূল্য শুরু হয়েছে প্রায় ৭০০ ডলার থেকে। অনেক সাধারণ সমর্থকের জন্য এই মূল্য বেশ ব্যয়বহুল বলে মনে করা হচ্ছে। তবুও বিপুল চাহিদার কারণে টিকিট বিক্রিতে কোনো ধীরগতি দেখা যাচ্ছে না।
ফাইনালের টিকিটের ক্ষেত্রে মূল্য আরও বিস্ময়কর। অফিসিয়াল বিক্রয় চ্যানেলেই ক্যাটাগরি-১ টিকিটের দাম ১০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফাইনালের টিকিটের জন্য এটি অন্যতম সর্বোচ্চ মূল্য।
শুধু স্টেডিয়াম নয়, আয়োজক শহরগুলোর হোটেল শিল্পও ব্যাপক সুবিধা পাচ্ছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে দর্শক ও পর্যটকদের চাপ বাড়ায় অনেক শহরে আবাসন সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে হোটেল ভাড়াও দ্রুত বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, আয়োজক শহরগুলোতে হোটেল ভাড়া গড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে গড়ে প্রতি রাতের জন্য ২২৭ ডলার খরচ হতো, এখন তা বেড়ে প্রায় ৪৮০ ডলারে পৌঁছেছে। পর্যটন খাতের জন্য এটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রচার স্বত্ব ও স্পনসরশিপও ফিফার আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে থাকছে। এবারের বিশ্বকাপ থেকে এই দুই খাত মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৯০ কোটি ডলার আয় করার আশা করছে সংস্থাটি। যা ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সাফল্য হতে পারে।
এর মধ্যে শুধু মিডিয়া সম্প্রচার স্বত্ব থেকেই প্রায় ৪২০ কোটি ডলার আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোটি কোটি দর্শক টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে খেলা দেখবেন। ফলে সম্প্রচার বাজারে বিশ্বকাপের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
গ্লোবাল স্পনসরশিপ থেকেও আসবে প্রায় ২৮০ কোটি ডলার। বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলো ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে পৌঁছানোর জন্য বিশ্বকাপ এখনও সবচেয়ে কার্যকর বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত।
যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজি ভাষার সম্প্রচার অধিকার পেয়েছে ফক্স, আর স্প্যানিশ ভাষার সম্প্রচার করবে টেলেমুন্ডো। ১০৪ ম্যাচের দীর্ঘ টুর্নামেন্ট সম্প্রচারকারীদের জন্য বিজ্ঞাপন বিক্রির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে তারাও এই বিশ্বকাপ থেকে রেকর্ড আয় করতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়, অর্থনীতি, ব্যবসা, পর্যটন এবং সম্প্রচারের ক্ষেত্রেও নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। কোটি কোটি সমর্থকের আবেগের পাশাপাশি এবার বিশ্বকাপকে ঘিরে ঘুরছে হাজার হাজার কোটি ডলারের বিশাল অর্থনৈতিক চাকা। ফুটবলের মহোৎসব তাই এবার একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ক্রীড়া আয়োজনেও পরিণত হয়েছে।




























