ঢাকা ১২:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo সৈয়দ আব্দুল হাদী বিশেষ সম্মাননা: শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে কিংবদন্তি গায়কের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি Logo ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল টাইগাররা Logo হেপাটাইটিস এ ও ই: কীভাবে ছড়ায় এবং সহজেই ঝুঁকি এড়াবেন Logo যশোরে সাবেক রাজনৈতিক নেতাকে আটক, গ্রেপ্তার ঘিরে পরিবারের অভিযোগ Logo এন্ট্রি-লেভেল প্রাইভেট ডাক্তারদের বেতন কাঠামো নির্ধারণে কমিটি গঠন Logo তাইওয়ানের রোবট কুকুর, চীনের হামলা ঠেকাতে নতুন সামরিক প্রযুক্তি Logo স্বাক্ষর বিতর্কে নতুন মোড়, তৃণমূলের একাধিক কার্যালয়ে তদন্ত সংস্থার তল্লাশি Logo লিচু দিয়ে রাবড়ি রেসিপি: গরমে ঘরেই তৈরি করুন সুস্বাদু ডেজার্ট Logo স্কুল ফিডিং খাদ্য বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, মাদারীপুরে দুই কর্মকর্তা আইনের আওতায় Logo পাওয়ার গ্রিড প্রতিষ্ঠানে ৪১ পদে নিয়োগ, আবেদন শুরু ১০ জুন

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সংসদে সালাহউদ্দিনের কঠোর মন্তব্য

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

দখল করা ব্যাংক বেদখল হয়ে যাবে, সেই যাতনা আমরা বুঝি—জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনায় এমন মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কারও নাম উল্লেখ না করলেও তাঁর বক্তব্যে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, শেয়ার কাঠামো, ঋণ বিতরণ এবং অতীতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা উঠে আসে।

মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদে ‘ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে প্রত্যর্পণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধে’ আনা একটি নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী নোটিশটি উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

আলোচনার শুরুতেই ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ এখন দাবি করছেন তাঁরা ব্যাংকের মালিক নন, আবার ইসলামের ওপর হাত না দেওয়ার কথাও বলছেন। এ ধরনের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয় এবং কোনো রাজনৈতিক দলও ইসলামের প্রতীক নয়।

তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলাম ব্যাংকের মালিক না, আবার বলা হচ্ছে ইসলামের ওপর হাত দেবেন না। ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনও ইসলাম নয়।” তাঁর এ বক্তব্য সংসদে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, একসময় ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছিল। এখন সেই নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা থেকে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, সেটিই বিভিন্ন বক্তব্য ও দাবির মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, “যে ব্যাংক আজান ও তকবিরের মাধ্যমে দখল করা হয়েছিল, সেই ব্যাংকের দখল যদি বেদখল হয়ে যায়, তাহলে যাতনা তো থাকবেই। সেই যাতনা আমরা বুঝতে পারছি।” তাঁর এই মন্তব্য সংসদ কক্ষে বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

আলোচনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, ওই সময়ের পর ব্যাংকের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যেগুলো তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস (রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম) প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগে ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, নির্বাচনী পরিস্থিতিকে সামনে রেখে ওই অতিরিক্ত অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে এবং এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কারা ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নাবিল গ্রুপকে দেওয়া ঋণের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে ৭০০ কোটি টাকার এলসির বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে পণ্য বিক্রি হলেও ব্যাংকের অর্থ ফেরত আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, ওই অর্থের একটি অংশ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নাবিল গ্রুপের আর্থিক দায়ের বিষয়টি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক দায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের দায় থাকা সত্ত্বেও কেন যথাযথ তদন্ত হয়নি, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে তদন্ত করা হবে। যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক খাতের অর্থের অপব্যবহার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনের আগে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই একটি গ্রুপকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআরের অর্থ ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, সিএসআরের নামে এমন কিছু ব্যয় হয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিমানের টিকিটসহ বিভিন্ন ব্যয়ের অর্থ সিএসআর খাত থেকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা খুঁজে বের করতে তদন্ত করা হবে।

ব্যাংকের জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর প্রায় ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।

তাঁর মতে, এসব কর্মীকে আইন ও বিধি অনুসরণ না করেই চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই সময়ে নতুন করে প্রায় ৬ হাজার জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অধিকাংশ নিয়োগ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

তিনি আরও বলেন, ওই সময়ে প্রায় ১৩ হাজার পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একই ব্যক্তিকে একাধিক ধাপে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, এসব অনিয়ম যদি তদন্ত করা হয়, তাহলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম সামনে আসতে পারে। তাই তদন্ত প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার প্রসঙ্গেও বিস্তারিত বক্তব্য দেন তিনি। তিনি বলেন, কেউ কীভাবে শেয়ার কিনেছেন, সেটি আলাদা বিতর্কের বিষয় হতে পারে। প্রয়োজনে তা দুর্নীতি দমন কমিশন বা আদালতের মাধ্যমে তদন্ত হতে পারে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে শেয়ারধারী হলে তাঁকে শেয়ারহোল্ডার হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। শেয়ার মালিকানার প্রশ্নে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ‘ডাকাতি করে নেওয়া হয়েছে’—এমন অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইবনে সিনার ২ শতাংশ শেয়ার ছিল এবং তারা ব্লক মার্কেটে তিন গুণ দামে সেই শেয়ার বিক্রি করেছে।

তিনি বলেন, বর্তমান শেয়ার কাঠামো অনুযায়ী একটি গ্রুপ প্রায় ৮১ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রকৃত ও বৈধ শেয়ারহোল্ডারদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ সময় তিনি কারা কত শতাংশ শেয়ারের মালিক, সেই তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানান। তাঁর মতে, মালিকানা কাঠামো স্বচ্ছ হলে অনেক বিতর্কের অবসান ঘটবে।

এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থপাচারের অভিযোগ নিয়েও সংসদে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে।

তাঁর মতে, শুধু একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠান নয়, যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সবার বিরুদ্ধেই তদন্ত হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব দেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের আমানতের অর্থ যারা অপব্যবহার করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। অর্থপাচার ও ব্যাংক খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথাও তিনি জানান।

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো তদন্তও চলমান নেই।

তবে ভবিষ্যতে নতুন কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা অবশ্যই তদন্ত করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইন ও বিধি অনুযায়ী সবার বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে হওয়া এই আলোচনা ব্যাংক খাতের মালিকানা, সুশাসন, ঋণ বিতরণ, নিয়োগ এবং অর্থপাচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

জনপ্রিয় সংবাদ

সৈয়দ আব্দুল হাদী বিশেষ সম্মাননা: শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে কিংবদন্তি গায়কের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সংসদে সালাহউদ্দিনের কঠোর মন্তব্য

Update Time : ০৯:০৫:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

দখল করা ব্যাংক বেদখল হয়ে যাবে, সেই যাতনা আমরা বুঝি—জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনায় এমন মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কারও নাম উল্লেখ না করলেও তাঁর বক্তব্যে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, শেয়ার কাঠামো, ঋণ বিতরণ এবং অতীতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা উঠে আসে।

মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদে ‘ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে প্রত্যর্পণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধে’ আনা একটি নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী নোটিশটি উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

আলোচনার শুরুতেই ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ এখন দাবি করছেন তাঁরা ব্যাংকের মালিক নন, আবার ইসলামের ওপর হাত না দেওয়ার কথাও বলছেন। এ ধরনের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয় এবং কোনো রাজনৈতিক দলও ইসলামের প্রতীক নয়।

তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলাম ব্যাংকের মালিক না, আবার বলা হচ্ছে ইসলামের ওপর হাত দেবেন না। ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনও ইসলাম নয়।” তাঁর এ বক্তব্য সংসদে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, একসময় ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছিল। এখন সেই নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা থেকে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, সেটিই বিভিন্ন বক্তব্য ও দাবির মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, “যে ব্যাংক আজান ও তকবিরের মাধ্যমে দখল করা হয়েছিল, সেই ব্যাংকের দখল যদি বেদখল হয়ে যায়, তাহলে যাতনা তো থাকবেই। সেই যাতনা আমরা বুঝতে পারছি।” তাঁর এই মন্তব্য সংসদ কক্ষে বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

আলোচনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, ওই সময়ের পর ব্যাংকের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যেগুলো তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন  জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, রোববার থেকে কার্যকর নতুন মূল্য

তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস (রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম) প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগে ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, নির্বাচনী পরিস্থিতিকে সামনে রেখে ওই অতিরিক্ত অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে এবং এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কারা ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নাবিল গ্রুপকে দেওয়া ঋণের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে ৭০০ কোটি টাকার এলসির বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে পণ্য বিক্রি হলেও ব্যাংকের অর্থ ফেরত আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, ওই অর্থের একটি অংশ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নাবিল গ্রুপের আর্থিক দায়ের বিষয়টি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক দায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের দায় থাকা সত্ত্বেও কেন যথাযথ তদন্ত হয়নি, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে তদন্ত করা হবে। যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক খাতের অর্থের অপব্যবহার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনের আগে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই একটি গ্রুপকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

আরও পড়ুন  এক-এগারোর মানবতাবিরোধী অপরাধে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকা

করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআরের অর্থ ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, সিএসআরের নামে এমন কিছু ব্যয় হয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিমানের টিকিটসহ বিভিন্ন ব্যয়ের অর্থ সিএসআর খাত থেকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা খুঁজে বের করতে তদন্ত করা হবে।

ব্যাংকের জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর প্রায় ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।

তাঁর মতে, এসব কর্মীকে আইন ও বিধি অনুসরণ না করেই চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই সময়ে নতুন করে প্রায় ৬ হাজার জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অধিকাংশ নিয়োগ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

তিনি আরও বলেন, ওই সময়ে প্রায় ১৩ হাজার পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একই ব্যক্তিকে একাধিক ধাপে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, এসব অনিয়ম যদি তদন্ত করা হয়, তাহলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম সামনে আসতে পারে। তাই তদন্ত প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার প্রসঙ্গেও বিস্তারিত বক্তব্য দেন তিনি। তিনি বলেন, কেউ কীভাবে শেয়ার কিনেছেন, সেটি আলাদা বিতর্কের বিষয় হতে পারে। প্রয়োজনে তা দুর্নীতি দমন কমিশন বা আদালতের মাধ্যমে তদন্ত হতে পারে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে শেয়ারধারী হলে তাঁকে শেয়ারহোল্ডার হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। শেয়ার মালিকানার প্রশ্নে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ‘ডাকাতি করে নেওয়া হয়েছে’—এমন অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইবনে সিনার ২ শতাংশ শেয়ার ছিল এবং তারা ব্লক মার্কেটে তিন গুণ দামে সেই শেয়ার বিক্রি করেছে।

আরও পড়ুন  প্রিপেইড মিটার চার্জ বাতিল ২০২৬: গ্রাহকদের বড় স্বস্তির ঘোষণা

তিনি বলেন, বর্তমান শেয়ার কাঠামো অনুযায়ী একটি গ্রুপ প্রায় ৮১ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রকৃত ও বৈধ শেয়ারহোল্ডারদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ সময় তিনি কারা কত শতাংশ শেয়ারের মালিক, সেই তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানান। তাঁর মতে, মালিকানা কাঠামো স্বচ্ছ হলে অনেক বিতর্কের অবসান ঘটবে।

এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থপাচারের অভিযোগ নিয়েও সংসদে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে।

তাঁর মতে, শুধু একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠান নয়, যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সবার বিরুদ্ধেই তদন্ত হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব দেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের আমানতের অর্থ যারা অপব্যবহার করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। অর্থপাচার ও ব্যাংক খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথাও তিনি জানান।

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো তদন্তও চলমান নেই।

তবে ভবিষ্যতে নতুন কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা অবশ্যই তদন্ত করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইন ও বিধি অনুযায়ী সবার বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে হওয়া এই আলোচনা ব্যাংক খাতের মালিকানা, সুশাসন, ঋণ বিতরণ, নিয়োগ এবং অর্থপাচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।