টমেটো ভর্তা কখনো কখনো শুধু একটি খাবার নয়, বরং শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের স্নেহ আর জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অনুভূতির নাম। লেখক সুমনা শারমীনের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে জ্বরের দিনগুলোর এমনই এক গল্প, যেখানে এক প্লেট ভাত আর টমেটো ভর্তা হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত খাবার।
স্কুলজীবনে একবার টানা কয়েক দিনের জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। সে সময় জ্বর হলে ভাত খাওয়া নিষেধ ছিল। তাই দিনের পর দিন পাউরুটি, স্যুপ ও হরলিকস খেতে খেতে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। এক দুপুরে পরিবারের সবাই যখন বিশ্রামে, তখন চুপিচুপি বিছানা ছেড়ে রান্নাঘরে চলে যান তিনি।
সেখানে গিয়ে দেখতে পান উষ্ণ ভাত আর পাশে রাখা টসটসে টমেটো ভর্তা। ক্ষুধার কাছে হার মেনে দ্রুত কয়েক লোকমা ভাত ও ভর্তা খেয়ে ফেলেন। এরপর সবকিছু আগের মতো গুছিয়ে রেখে আবার বিছানায় ফিরে আসেন। পরিবারের কেউ বিষয়টি বুঝতে পারেনি।
তবে সন্ধ্যার পর আবার জ্বর বেড়ে গেলে ছোট্ট সুমনার মনে জন্ম নেয় অপরাধবোধ। তিনি ভাবতে থাকেন, লুকিয়ে ভাত আর টমেটো ভর্তা খাওয়ার কারণেই হয়তো জ্বর ফিরে এসেছে। পরে অবশ্য বুঝতে পারেন, জ্বর বাড়ার সঙ্গে খাবারের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবুও সেই দুপুরের স্মৃতি আজও তাঁর মনে অমলিন।
লেখকের স্মৃতিতে শুধু টমেটো ভর্তাই নয়, জায়গা করে নিয়েছে নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী একটি নাশতাও। গরমের ছুটি কিংবা ঈদের ছুটিতে দাদুর বাড়িতে গেলে সকালে পরিবেশন করা হতো ছোট আলু দিয়ে রান্না করা বাচ্চা মুরগির ঝোল আর গরম গরম ছিটা রুটি।
এই ছিটা রুটি তৈরি হতো একেবারে অতিথিদের সামনে। চালের গুঁড়া, লবণ ও পানি মিশিয়ে তৈরি করা মিশ্রণ গরম কড়াইতে ছিটিয়ে বানানো হতো জালির মতো পাতলা রুটি। এরপর তা পরিবেশন করা হতো সুস্বাদু মুরগির ঝোলের সঙ্গে।
জীবনের নানা সময়ে অসংখ্য খাবার খেলেও লেখকের স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে জ্বরের দিনে খাওয়া টমেটো ভর্তা এবং দাদুর বাড়ির ছিটা রুটি। কারণ খাবারের স্বাদ শুধু জিভে নয়, অনেক সময় স্মৃতি আর অনুভূতির ভেতরেও গেঁথে থাকে।
খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই স্মৃতিগুলোই প্রমাণ করে, সাধারণ কোনো রান্নাও জীবনের বিশেষ মুহূর্তে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। আর তাই বহু বছর পরেও জ্বরমুখে খাওয়া টমেটো ভর্তার স্বাদ কিংবা গরম কড়াই থেকে নামানো ছিটা রুটির ঘ্রাণ মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের সেই প্রিয় দিনগুলোতে।



























