সন্তানদের দানেও ইনসাফ জরুরি—ইসলামের পারিবারিক শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক এটি। সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা, স্নেহ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যেমন ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন, তেমনি সম্পদ, উপহার বা হিবা প্রদানের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ইসলামী শরিয়ত পরিবারে শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখতে সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য না করার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে সুশৃঙ্খল ও ন্যায়ভিত্তিক করার শিক্ষা দেয়। পরিবার সমাজের মৌলিক ভিত্তি হওয়ায় সেখানে অবিচার বা পক্ষপাতিত্বের কোনো স্থান নেই।
বিশেষ করে সন্তানদের মধ্যে সম্পদ বণ্টন কিংবা উপহার প্রদানের ক্ষেত্রে একজনকে বেশি এবং অন্যজনকে কম দেওয়া অনেক সময় পারিবারিক সম্পর্কের অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে ভাই-বোনদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় এবং বাবা-মায়ের প্রতিও নেতিবাচক মনোভাব জন্ম নিতে পারে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ন্যায়বিচারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সুরা বাকারার ১৮০ নম্বর আয়াতে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে ইনসাফের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিধান নির্ধারিত হওয়ার পর ওয়ারিশদের জন্য ওসিয়তের বিষয়টি রহিত হয়েছে, তবুও ন্যায়বিচারের মূল শিক্ষা বহাল রয়েছে।
তাফসিরবিদদের মতে, উত্তরাধিকার আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে প্রত্যেক হকদারের প্রাপ্য অংশ নির্ধারিত হয়ে গেছে। তাই কোনো ব্যক্তি নিজের ইচ্ছামতো উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ পান না। ইসলামী বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক ওয়ারিশ তার নির্ধারিত অংশ পাওয়ার অধিকার রাখে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি বিখ্যাত হাদিস মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে। সাহাবি নুমান ইবনে বাশীর (রা.) বলেন, তার পিতা তাকে বিশেষভাবে কিছু সম্পদ দান করেছিলেন। কিন্তু তার মা এ বিষয়ে সন্তুষ্ট হননি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী রাখার পরামর্শ দেন। এরপর বিষয়টি মহানবীর সামনে উপস্থাপন করা হলে তিনি জানতে চান, অন্য সন্তানদেরও একই পরিমাণ দান করা হয়েছে কি না।
নুমান (রা.)-এর পিতা যখন জানান যে অন্য সন্তানদের সমপরিমাণ দান করা হয়নি, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।” এরপর ওই সাহাবি তার দেওয়া দান ফিরিয়ে নেন। এই ঘটনা ইসলামে পারিবারিক ন্যায়বিচারের গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। অন্য একটি বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “আমি জুলুমের ব্যাপারে সাক্ষী হই না।” অর্থাৎ সন্তানদের মধ্যে বৈষম্যমূলক দানকে তিনি এক ধরনের অবিচার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত বিষয় নয়; বরং পরিবার ও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
হাদিসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে মহানবী (সা.) প্রশ্ন করেন, “তুমি কি চাও তোমার সব সন্তান তোমার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করুক?” সাহাবি ইতিবাচক উত্তর দিলে তিনি বলেন, “তাহলে এমন করো না।” অর্থাৎ একজনকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য অনেক সময় মানসিক ক্ষোভ ও হীনমন্যতার জন্ম দেয়। কোনো সন্তান যদি মনে করে যে তাকে অবহেলা করা হচ্ছে, তবে তার মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এই অনুভূতি পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্ক বিচ্ছেদের কারণও হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান সমাজে এমন ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। কোনো সন্তান বাবা-মায়ের কাছাকাছি থাকেন, কেউ ব্যবসা দেখাশোনা করেন বা কারও প্রতি আবেগ বেশি থাকে—এসব কারণে অনেক সময় সম্পদ বা উপহারের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা হয়। আবার কখনো নাতি-নাতনিদের মধ্যেও বৈষম্যমূলক আচরণ দেখা যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এসব আচরণ কাম্য নয়। তবে ইসলামী আইনবিদরা উল্লেখ করেছেন, কোনো সন্তানের বিশেষ প্রয়োজন থাকলে যৌক্তিক কারণে তাকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। যেমন গুরুতর অসুস্থতা, শারীরিক অক্ষমতা বা আর্থিক সংকটের ক্ষেত্রে প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতা বৈষম্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এর পেছনে ব্যক্তিগত পক্ষপাত নয়, বাস্তব প্রয়োজনই বিবেচ্য হতে হবে।
পরিবারে শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে বাবা-মায়ের উচিত সন্তানদের প্রতি সমান আচরণ করা। শুধু সম্পদের ক্ষেত্রেই নয়, ভালোবাসা, মনোযোগ, প্রশংসা এবং সময় দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ শিশু ও তরুণদের মানসিক বিকাশে এসব বিষয় গভীর প্রভাব ফেলে। ইসলামের শিক্ষা হলো ন্যায়, ভারসাম্য ও মানবিকতা। সন্তানদের মধ্যে সমবণ্টন এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু একটি ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, বরং সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক গঠনের অন্যতম ভিত্তি। যে পরিবারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধও বৃদ্ধি পায়।
সন্তানদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই স্নেহ যদি অন্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তাহলে তা কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ ডেকে আনতে পারে। তাই ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ বজায় রাখা এবং সম্পদ, উপহার কিংবা সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। পরিবারে স্থায়ী শান্তি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার জন্য এ শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।





























