রিয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। মানুষের বাহ্যিক শত্রু যতই শক্তিশালী হোক না কেন, অন্তরের শত্রু অনেক সময় তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। রিয়া এমন একটি মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি, যা মানুষের নেক আমলকে ধ্বংস করে দেয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা অর্জনের দিকে ধাবিত করে। তাই রিয়ার ভয়াবহতা উপলব্ধি করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো আমল তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত হয়। কিন্তু যখন সেই আমলের সঙ্গে মানুষের প্রশংসা, সম্মান বা মর্যাদা লাভের আকাঙ্ক্ষা যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেখানে রিয়ার অনুপ্রবেশ ঘটে। ফলে বাহ্যিকভাবে আমল যত সুন্দরই হোক না কেন, তার প্রকৃত মূল্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষের দ্বীনের ওপর দুনিয়ার লোভ এবং মর্যাদার আকাঙ্ক্ষার ক্ষতিকর প্রভাব বোঝাতে একটি অসাধারণ উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে যদি ছাগলের পালের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তারা যে ক্ষতি করবে, মানুষের সম্পদ ও সম্মানের লোভ তার দ্বীনের জন্য তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।

এই হাদিসের মাধ্যমে একটি গভীর বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। ক্ষুধার্ত নেকড়ে যখন অসহায় ছাগলের পালে প্রবেশ করে, তখন তারা নির্বিচারে আক্রমণ চালায়। অল্প কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ ছাগলই তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায় না। একইভাবে রিয়া মানুষের অন্তরে প্রবেশ করলে ধীরে ধীরে তার ইবাদত, তাকওয়া এবং আন্তরিকতা ধ্বংস হতে থাকে। রিয়ার ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় তখন, যখন মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে মানুষের প্রশংসাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। সে নামাজ পড়ে, দান করে বা অন্যান্য ইবাদত সম্পাদন করে; কিন্তু তার অন্তরে মানুষের কাছে ভালো পরিচিতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। এ অবস্থায় আমলের প্রকৃত উদ্দেশ্য বিকৃত হয়ে যায়।
রিয়া মানুষের হৃদয়ে অহংকারের বীজ বপন করে। মানুষ মনে করতে শুরু করে যে সে অন্যদের চেয়ে বেশি ধার্মিক বা বেশি সৎ। এই মানসিকতা ধীরে ধীরে আত্মপ্রশংসা এবং আত্মতুষ্টির জন্ম দেয়। ফলে সে নিজের ভুলত্রুটি সংশোধনের পরিবর্তে বাহ্যিক পরিচিতি রক্ষায় বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় রিয়া এতটাই সূক্ষ্মভাবে মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে যে সে নিজেও তা বুঝতে পারে না। কেউ হয়তো ইবাদত শুরু করেছিল আল্লাহর জন্য, কিন্তু মানুষের প্রশংসা শুনতে শুনতে তার নিয়ত পরিবর্তিত হয়ে যায়। এ কারণেই ইসলামে নিয়তকে বারবার বিশুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রিয়ার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো এটি মানুষের আখিরাতের পুঁজি নষ্ট করে দেয়। একজন ব্যক্তি বহু বছর ধরে ইবাদত করতে পারেন, কিন্তু যদি সেই ইবাদতের পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে লোক দেখানো প্রবণতা থাকে, তাহলে সেই আমলের প্রতিদান থেকে তিনি বঞ্চিত হতে পারেন। তাই রিয়া শুধু একটি নৈতিক দুর্বলতা নয়; এটি আখিরাতের জন্যও বড় বিপদ। দুনিয়ার সম্পদ, খ্যাতি এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ অনেক সময় রিয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ যখন নিজেকে অন্যদের সামনে বড় করে উপস্থাপন করতে চায়, তখন তার ইবাদতেও সেই মানসিকতার প্রভাব পড়ে। ফলে ইখলাস বা একনিষ্ঠতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রিয়ার ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে প্রথমেই নিজের নিয়ত পরীক্ষা করতে হবে। প্রতিটি আমলের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, আমি এই কাজটি কার জন্য করছি? যদি উত্তর হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তাহলে সেই নিয়তকে দৃঢ় রাখতে হবে। আর যদি মানুষের প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা অনুভূত হয়, তাহলে তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। গোপনে নেক আমল করার অভ্যাসও রিয়া থেকে বাঁচার একটি কার্যকর উপায়। মানুষ যখন এমন ইবাদত করে যা অন্য কেউ জানে না, তখন সেখানে লোক দেখানোর সুযোগ কম থাকে। তাই সালাফে সালেহিন অনেক সময় নিজেদের নেক আমল গোপন রাখার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
আল্লাহর কাছে ইখলাসের জন্য দোয়া করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের অন্তর আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। তাই তাঁর সাহায্য ছাড়া অন্তরের রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। নিয়মিত দোয়া এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখতে পারেন। সর্বোপরি, রিয়ার ভয়াবহতা নেকড়ে বাঘের আক্রমণের চেয়েও বেশি ধ্বংসাত্মক। নেকড়ে বাঘ শুধু দুনিয়ার ক্ষতি করে, কিন্তু রিয়া মানুষের দ্বীন, আমল এবং আখিরাতকে বিপন্ন করে তোলে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজের নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখা, আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো এবং লোক দেখানো প্রবণতা থেকে সর্বদা সতর্ক থাকা। ইখলাসই হলো নেক আমলের প্রাণ, আর রিয়া সেই প্রাণকে ধ্বংস করে দেওয়া এক ভয়ংকর আত্মিক ব্যাধি।





























