সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আজ ২৩ জুন পদার্পণ করলেন জীবনের ৯০ বছর পূর্তিতে। বিরূপ, প্রতিকূল এবং বিপন্ন সময়েও যিনি সর্বদা স্পষ্ট, ঋজু ও নিরাবেগ কণ্ঠে সত্য কথা বলে আমাদের পথ দেখিয়ে চলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইংরেজি বিভাগের এই সাবেক শিক্ষক আজ কোনো পদ-পদবি ছাড়াই পুরো বাঙালি জাতির এক অনন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন। ১৯৩৬ সালের এই দিনে বিক্রমপুরের নানাবাড়িতে জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষটি আজীবন মানুষের মাঝে জ্ঞান বিলিয়েছেন।
শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিষ্ঠা ও একাগ্রতা এতটাই প্রবাদপ্রতিম যে, নিজের স্ত্রীর মৃত্যুর দিনেও তিনি ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। পরিমিত জীবনযাপন ও কঠোর শৃঙ্খলাই তাঁকে এই বয়সেও দারুণ সুঠাম ও প্রখর স্মৃতির অধিকারী রেখেছে। কৈশোরে হাতে লেখা পত্রিকা বের করা এই চিন্তাবিদ মূলত গল্পকার হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সময়ের আবর্তে তিনি হয়ে উঠেছেন দেশসেরা প্রাবন্ধিক। তাঁর বিখ্যাত বই ‘আমার পিতার মুখ’ বা ‘শেকস্পীয়রের মেয়েরা’ পাঠকদের আজও গভীরভাবে মুগ্ধ করে।
আমাদের অনলাইন সংবাদ আর্কাইভ-এর পুরনো কলামগুলোতেও তাঁর লেখা সমাজ ও রাজনীতির নিখুঁত বিশ্লেষণ বারবার প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মিছিলে কাঁদানে গ্যাসের মুখোমুখি হওয়া থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি—সবকিছুই তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি সবসময় বিশ্বাস করেন যে স্মৃতিভ্রংশ জাতি কখনোই স্বাভাবিক জাতি হতে পারে না। তাই তো পুঁজিবাদী অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমষ্টির মুক্তির স্বপ্ন তিনি আজীবন বুনে চলেছেন।
বিলেতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সময় সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন বুকে ধারণ করা এই বাতিঘর দীর্ঘ একাকী জীবনে দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে সাহিত্য ও সমাজের সেবা করে যাচ্ছেন। তাঁর স্পষ্ট চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধ সমাজকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। পৃথিবীর পরিবেশ ও মানুষকে বাঁচাতে হলে হৃদয়বান ও বুদ্ধিমান মানুষের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। ৯০ বছর বয়সে পৌঁছে একজন মানুষের এই অটুট বিশ্বাস ধরে রাখা সহজ নয়।
আমাদের এই ধূসর শহরে যখন কোনো আশ্রয় থাকে না, তখন আমরা তাঁর স্পষ্ট লেখার মাঝে নতুন আলোর রেখা খুঁজে পাই। আজকের এই বিশেষ দিনে আমরা শ্রদ্ধেয় ‘সিক স্যার’কে জানাই অন্তহীন শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। এই অনন্য ব্যক্তিত্বের শিক্ষা ও আদর্শকে ধারণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। তাঁর লেখা প্রতিটি শব্দ তরুণ সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখায় এবং অধিকার সচেতন করে তোলে।
প্রকৃত কৃষকদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে এবং সরকারি তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই প্রবীণ শিক্ষকের লেখা আমাদের বড় অনুপ্রেরণা। দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়-এর আদর্শিক স্তম্ভের দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করাই আজ প্রতিটি নাগরিকের একমাত্র প্রত্যাশা। স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, আর স্যার আমাদের সেই স্বপ্ন দেখানোর কারিগর। বাঙালি জাতি তাঁর এই অসামান্য অবদানকে চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।





























