দেশে প্রশাসনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে তিনটি নতুন উপজেলা এবং একটি নতুন থানা গঠনের অনুমোদন দিয়েছে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার)। বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত নিকারের ১২১তম বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে চট্টগ্রামের হালদা নামে নতুন একটি থানা এবং চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে তিনটি নতুন উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রশাসনিক সেবা জনগণের আরও কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় নতুন উপজেলা ও থানা গঠনের দাবি ছিল। সেই দাবির প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রশাসনিক সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন উপজেলা তিনটি হলো চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উত্তর, কুমিল্লার বাঙ্গরা এবং ময়মনসিংহের দক্ষিণ গফরগাঁও। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানাকে বিভক্ত করে নতুন হালদা থানা গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু সাংবাদিকদের জানান, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন উপজেলা ও থানা চালু হলে নাগরিক সেবার মান আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিকারের অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা গঠন করা হয়েছে। বৃহৎ আয়তনের ফটিকছড়ি উপজেলাকে প্রশাসনিকভাবে আরও কার্যকর করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন উপজেলা গঠনের ফলে স্থানীয় জনগণকে বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে না।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার একটি অংশ নিয়ে ‘বাঙ্গরা’ উপজেলা গঠন করা হয়েছে। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন উপজেলা চালু হলে স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানার আটটি ইউনিয়ন নিয়ে ‘দক্ষিণ গফরগাঁও’ উপজেলা গঠন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটির জনগণ আলাদা উপজেলা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। নতুন উপজেলা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সরকারি সেবা সহজলভ্য হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানাকে বিভক্ত করে নতুন ‘হালদা’ থানা গঠনের সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। হালদা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ এলাকার জনগণ এতদিন হাটহাজারী থানার মাধ্যমে প্রশাসনিক সেবা গ্রহণ করতেন। নতুন থানা প্রতিষ্ঠার ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিক সেবা আরও দ্রুত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক চাপ বাড়ার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন উপজেলা ও থানা গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বড় প্রশাসনিক ইউনিটগুলোকে ছোট ছোট ইউনিটে বিভক্ত করলে সেবা প্রদানের গতি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।
নিকারের বৈঠকে শুধু নতুন উপজেলা ও থানা অনুমোদনই নয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন পূর্বাঞ্চল নতুন শহর প্রকল্প সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার অংশগুলোকে ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
সরকারের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প পরিচালনা ও নগর পরিকল্পনা কার্যক্রম আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নগরায়ণ পরিকল্পনায় সমন্বয় সাধন করা সম্ভব হবে।
বৈঠকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বৈঠকে অংশ নেন। তাদের উপস্থিতিতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন উপজেলা ও থানা গঠনের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তদারকি কার্যক্রমও আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যাবে।
স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা, দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন উপজেলা ও থানার অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। এতে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমবে এবং সরকারি সেবা গ্রহণে সময় ও ব্যয় দুটোই হ্রাস পাবে।
নিকারের সর্বশেষ এই সিদ্ধান্ত দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন উপজেলা ও থানা চালু হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।



























