নুরুন্নাহার নিম্নি বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, প্রতিকূল আবহাওয়া আর কঠিন অভিযাত্রা পেরিয়ে বুধবার ভোরে বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখর মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন এই বাংলাদেশি নারী। এর মাধ্যমে নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীনের পর বাংলাদেশের তৃতীয় নারী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় উঠলেন তিনি।
নুরুন্নাহার নিম্নি বুধবার নেপাল সময় সকাল ৫টা ২৪ মিনিটে এভারেস্টের শিখরে পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন নেপালের একটি অভিযাত্রী দলের শেরপা সদস্য। খবরটি নিশ্চিত করেছে বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব। দেশের একমাত্র নারী অভিযাত্রী হিসেবে এবার এভারেস্ট মিশনে অংশ নেন নিম্নি।
২০১২ সালে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে নিশাত মজুমদার এভারেস্ট জয় করেন। একই বছরে শিখরে ওঠেন ওয়াসফিয়া নাজরীন। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছর পর আবারও কোনো বাংলাদেশি নারী এভারেস্টের চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা উড়ালেন।
গত ১১ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপালের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন নুরুন্নাহার নিম্নি। কাঠমান্ডু থেকে লুকলা হয়ে পৌঁছান এভারেস্ট বেজক্যাম্পে। ধাপে ধাপে উচ্চতাজনিত পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন তিনি। সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি সময়কে এভারেস্ট সামিটের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ধরা হয়।
১৭ মে বেজক্যাম্প ছেড়ে চূড়ান্ত অভিযানে বের হন নিম্নি। বিভিন্ন ক্যাম্প অতিক্রম করে ২৩ মে পৌঁছান ক্যাম্প-৪ এ। সেদিনই শিখরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাকে ফিরে আসতে হয়। কয়েকদিন ক্যাম্প-২ এ অবস্থান করে আবহাওয়া অনুকূলে এলে আবারও যাত্রা শুরু করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত সব বাধা পেরিয়ে নুরুন্নাহার নিম্নি এভারেস্ট জয় করতে সক্ষম হন। তার এই সাফল্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দনের জোয়ার বইছে। অনেকেই এটিকে বাংলাদেশের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
বর্তমানে পূবালী ব্যাংক পিএলসি-এর জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন নিম্নি। তার এই অভিযানের স্পনসরও ছিল প্রতিষ্ঠানটি। রংপুরে বেড়ে ওঠা নিম্নি পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ভূতত্ত্ব বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই পাহাড়ের প্রতি তার ভালোবাসা তৈরি হয়। ২০০৬ সালে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ফিল্ডওয়ার্ক করতে গিয়ে পর্বতের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করেন। এরপর বান্দরবানের বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ে ভ্রমণ করেন নিয়মিত। চাকরিজীবন শুরু হলেও সেই স্বপ্ন থেমে থাকেনি।
২০১৯ সালে নেপালের অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্পে ট্রেকিং করার পর আরও বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। পরে ২০২০ সালে এভারেস্ট বেজক্যাম্প ট্রেক সম্পন্ন করেন। সেখান থেকেই পেশাদার পর্বতারোহী হওয়ার অনুপ্রেরণা পান। ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ে অবস্থিত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নেন।
বাংলাদেশের এভারেস্ট জয়ের ইতিহাসও বেশ গৌরবময়। মুসা ইব্রাহীম ২০১০ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন। এরপর এম এ মুহিত দুবার এভারেস্ট জয় করেন। ২০২৪ সালে বাবর আলী এবং ২০২৫ সালে ইকরামুল হাসান শাকিল এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন।
নুরুন্নাহার নিম্নির এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের নারীদের সাহস, অধ্যবসায় ও স্বপ্ন দেখার শক্তির প্রতীক হয়ে থাকবে। তার এই এভারেস্ট জয় নতুন প্রজন্মের জন্যও হয়ে উঠতে পারে বড় অনুপ্রেরণার গল্প।






















