ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাত বিশ্বকে নতুন একটি বাস্তবতা দেখিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সস্তা কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তি এমনভাবে শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে যে, তুলনামূলক দুর্বল দেশও এখন শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা।
গত ২০ জুন প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা যায়, ইসরায়েলের ৯০ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে কৌশলগতভাবে ইরানই এগিয়ে ছিল। এর পরদিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিবিএসের জরিপে দেখা যায়, ৭৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধবিরতির পক্ষে মত দিয়েছেন। মাত্র ২২ শতাংশ মনে করেন, ইরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত।
যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নেওয়া দেশগুলোর বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, এই দীর্ঘ আকাশযুদ্ধের বড় শিক্ষা হলো—শুধু উন্নত যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়, কম খরচের ড্রোনও এখন যুদ্ধের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ কারণেই যুদ্ধ শেষে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণেও দ্রুত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
২৪ জুন কাতারের প্রধানমন্ত্রী জানান, উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। একই সঙ্গে ইরানকে নিয়ে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা চলছে। কয়েক মাস আগেও এমন সম্ভাবনা প্রায় অকল্পনীয় ছিল।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো ইরানকে নিজেদের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। অথচ সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর তারাই এখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ খুঁজছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বড় যুদ্ধের পর এমন কূটনৈতিক পরিবর্তন ইতিহাসে নতুন নয়।
বিখ্যাত বিপ্লবী চিন্তাবিদ লিওন ট্রটস্কি বলেছিলেন, “যুদ্ধ হলো ইতিহাসের ইঞ্জিন।” ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় যুদ্ধ শুধু ভূখণ্ডের মানচিত্রই বদলায় না; বদলে দেয় শক্তির ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক জোট এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কও।
সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের অন্যতম বড় কৌশল ছিল হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল কার্যকর হওয়ার মূল কারণ ছিল ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত ব্যবহার। আধুনিক প্রযুক্তির এই সমন্বয় প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে।
সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘রেভুলেশন ইন মিলিটারি অ্যাফেয়ার্স’ বা যুদ্ধক্ষেত্রে বিপ্লব। অর্থাৎ এমন প্রযুক্তি, কৌশল বা সংগঠনগত পরিবর্তন, যা যুদ্ধ পরিচালনার ধরনকে মৌলিকভাবে বদলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ধারণা সামরিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বকে দেখিয়েছিল প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব কীভাবে যুদ্ধের ফল বদলে দিতে পারে। তবে বর্তমান যুগে ড্রোন সেই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে।
ইতিহাসে এমন সামরিক বিপ্লব বহুবার ঘটেছে। ব্রোঞ্জ যুগে যুদ্ধরথের আবিষ্কার, রোমান লেজিয়নের সংগঠিত সেনাবাহিনী, চেঙ্গিস খানের গতিশীল অশ্বারোহী বাহিনী কিংবা বাবরের চলমান কামানের ব্যবহার—সবই তাদের সময়ে যুদ্ধের নিয়ম পাল্টে দিয়েছিল।
একইভাবে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তাঁর কর্পস পদ্ধতির মাধ্যমে ইউরোপের সামরিক কৌশল বদলে দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির ব্লিৎজক্রিগ কৌশলও যুদ্ধ পরিচালনায় নতুন যুগের সূচনা করেছিল। পরে পারমাণবিক অস্ত্র আবিষ্কার বিশ্বরাজনীতিকে সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় নিয়ে যায়।
তবে সব সামরিক বিপ্লব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রতিপক্ষ একই প্রযুক্তি আয়ত্ত করলে বা তার কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুললে আগের সুবিধা কমে যায়। এখন প্রশ্ন উঠছে, ড্রোন প্রযুক্তি কি তেমনই সাময়িক পরিবর্তন, নাকি এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক বাস্তবতা হয়ে উঠবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বলছে ড্রোন কেবল একটি নতুন অস্ত্র নয়; এটি যুদ্ধের অর্থনীতি বদলে দিয়েছে। আগে উন্নত অস্ত্র তৈরি ও পরিচালনায় বিপুল অর্থ ব্যয় হতো। এখন তুলনামূলক কম খরচে একই ধরনের কৌশলগত প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
গত এক দশকে হালকা ব্যাটারি, ক্ষুদ্র ক্যামেরা, উন্নত মাইক্রোচিপ, জিপিএস, সেন্সর এবং থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির ফলে ড্রোন তৈরির খরচ নাটকীয়ভাবে কমেছে। স্মার্টফোন শিল্পের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিও এতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্বের বাণিজ্যিক ড্রোন বাজারে চীনের আধিপত্য এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বাজারে সহজলভ্য প্রযুক্তিকে সামরিক কাজে ব্যবহার করতে এখন কেবল দক্ষ প্রকৌশলী ও সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হচ্ছে।
ইউক্রেন এবং ইরানের যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এনেছে দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোনকে। ছোট বিমানের মতো দেখতে এসব ড্রোন ৫০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
এই ড্রোনগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এগুলো খুব নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়ায় প্রচলিত রাডারে সহজে ধরা পড়ে না। ফলে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অনেক সময় এগুলো শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।
এসব ড্রোনে ব্যবহৃত ইঞ্জিন অত্যন্ত সাধারণ। অনেক ক্ষেত্রে ঘাস কাটার যন্ত্র বা স্কুটারের ইঞ্জিনের মতো সস্তা ইঞ্জিনই ব্যবহার করা হয়। নেভিগেশনের জন্য ব্যবহৃত হয় বাজারে সহজলভ্য জিপিএস, গ্লোনাস, গ্যালিলিও কিংবা বাইডু স্যাটেলাইট ব্যবস্থা।
একেকটি দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোন তৈরিতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার ডলার খরচ হয়। অথচ এগুলো ধ্বংস করতে যে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তার মূল্য কয়েক লাখ থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
এই ‘কস্ট এক্সচেঞ্জ’ বা বিনিময় ব্যয়ের পার্থক্যই যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনকে এত কার্যকর করে তুলেছে। শত শত সস্তা ড্রোন একসঙ্গে হামলা চালালে প্রতিপক্ষকে বিপুল ব্যয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
রাশিয়া প্রথমে ইরানের তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনে হামলা চালায়। পরে তারা নিজেরাই ‘গেরান’ নামে একই ধরনের ড্রোন উৎপাদন শুরু করে। অন্যদিকে ইউক্রেনও ‘বোবার’সহ নিজস্ব দূরপাল্লার ড্রোন তৈরি করে রাশিয়ার গভীরে আঘাত হানছে।
তেল শোধনাগার, বিমানঘাঁটি, অস্ত্র কারখানা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। একই ধরনের কৌশল ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ব্যবহার করেছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অন্যতম বড় উদ্বেগ ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। বিশ্লেষকদের মতে, এটিও যুদ্ধবিরতি ত্বরান্বিত হওয়ার একটি বড় কারণ।
বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক এলাকায় ড্রোন প্রতিহত করতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের ভারী মেশিনগান পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ সব সময় ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ছোট ড্রোন ধ্বংস করা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব নয়।
ড্রোন প্রযুক্তির আরেকটি বড় পরিবর্তন এনেছে ‘ফার্স্ট পারসন ভিউ’ বা এফপিভি ড্রোন। এগুলো পরিচালনাকারী সরাসরি ক্যামেরার দৃশ্য দেখে ড্রোনকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালিত করতে পারেন।
প্রথম দিকে এ ধরনের ড্রোন সহজেই ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের শিকার হতো। কিন্তু এখন অনেক এফপিভি ড্রোনে অত্যন্ত পাতলা ফাইবার অপটিক কেবল ব্যবহার করা হচ্ছে, যা জ্যাম করা প্রায় অসম্ভব।
এই প্রযুক্তির কারণে ড্রোন অপারেটর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ফলে ট্যাংক, বাঙ্কার, সাঁজোয়া যান কিংবা নির্দিষ্ট সামরিক অবস্থানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানা সম্ভব হচ্ছে।
গত কয়েক মাসে ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে অসংখ্য সেনা এফপিভি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে। এর ফলে অনেক এলাকায় স্থলযুদ্ধের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
অন্যদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহও ইরানের সহায়তায় পাওয়া এফপিভি ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েলি ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেনাদের ওপর একাধিক সফল হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সস্তা উৎপাদন ব্যয়, নির্ভুল লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতার কারণে ড্রোন এখন দুর্বল রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম কার্যকর অস্ত্র।
রাশিয়া জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে ইউক্রেনের তুলনায় অনেক এগিয়ে। একইভাবে ইরানের প্রতিপক্ষদের সম্মিলিত সামরিক সক্ষমতাও অনেক বেশি। তবুও ড্রোন প্রযুক্তি তুলনামূলক দুর্বল পক্ষকে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতের ড্রোন আরও উন্নত হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এজ কম্পিউটিং এবং স্বয়ংক্রিয় লক্ষ্য শনাক্তকরণ প্রযুক্তি যুক্ত হলে ড্রোন মানব নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিয়ে হামলা চালাতে পারবে।
এজ কম্পিউটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রোন কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক বা জিপিএস ছাড়াই নিজস্ব কম্পিউটিং ক্ষমতা ব্যবহার করে লক্ষ্য নির্ধারণ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে চলা এবং আক্রমণ পরিচালনা করতে পারবে। এতে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের পরিবেশেও ড্রোন কার্যকর থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত। তাই শক্তিশালী হোক বা দুর্বল—প্রতিটি রাষ্ট্রকেই নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করবে শুধু সেনাসংখ্যা নয়, বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তিও।



























