বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের বিপক্ষে মাঠে নামছে ব্রাজিল। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে সেলেসাওদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারেন আর্লিং হলান্ড। তবে ব্রাজিল শিবিরে আত্মবিশ্বাসের বড় কারণ, ডাগআউটে আছেন এমন একজন কোচ যিনি অতীতে একাধিকবার হলান্ডকে কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেখিয়েছেন। সেই কোচ কার্লো আনচেলত্তির পুরোনো কৌশল এবার আন্তর্জাতিক ফুটবলেও কাজে লাগে কি না, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
হলান্ডকে থামানোর ক্ষেত্রে আনচেলত্তির দর্শন বরাবরই একটু ভিন্ন। তিনি কখনোই একজন খেলোয়াড়কে আলাদা করে আটকানোর পরিকল্পনায় বিশ্বাস করেন না। বরং পুরো প্রতিপক্ষ দলকে নিয়ন্ত্রণে রেখে হলান্ডের কাছে বল পৌঁছানোর পথ বন্ধ করাকেই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, গোলমেশিনকে থামাতে হলে আগে সরবরাহ লাইন কেটে দিতে হবে।
এই কৌশলের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ দেখা যায় ২০২৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার সিটির লড়াইয়ে। ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে আনচেলত্তি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর পরিকল্পনা শুধু হলান্ডকে ঘিরে নয়। বরং পুরো সিটিকে চাপে রাখা এবং বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখাই ছিল মূল লক্ষ্য।
সেই ম্যাচে রিয়ালের হয়ে হলান্ডকে সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন আন্তোনিও রুডিগার। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শারীরিক লড়াইয়ে হলান্ডকে ব্যস্ত রাখেন জার্মান এই ডিফেন্ডার। অন্যদিকে রিয়ালের মিডফিল্ড ও ডিফেন্স একসঙ্গে এমনভাবে কভারিং দেয় যে, নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার খুব কমবারই বিপজ্জনক জায়গায় বল পান।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ম্যাচ শেষে বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছিল, পুরো ম্যাচে হলান্ড শট নেওয়ার মতো সুযোগই খুব কম পেয়েছিলেন। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হলেও আনচেলত্তির কৌশল ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। বিশেষ করে হলান্ডকে কার্যত ম্যাচের বাইরে রাখার পরিকল্পনাকে অনেকেই ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস হিসেবে দেখেছিলেন।
পরে সেই ম্যাচ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রুডিগারও দলগত প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। তাঁর ভাষায়, হলান্ডকে আটকে রাখার কৃতিত্ব শুধু একজনের নয়। সতীর্থরা দারুণভাবে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল বলেই হলান্ড কাঙ্ক্ষিত পাস পায়নি এবং স্বাভাবিক খেলাও খেলতে পারেনি।
পরের মৌসুমেও আনচেলত্তি একই পরিকল্পনায় অটল ছিলেন। আবারও রুডিগারকে মূল দায়িত্ব দিয়ে পুরো রক্ষণভাগকে ঘন করে সাজানো হয়। হলান্ডের সঙ্গে একের পর এক শারীরিক দ্বৈরথে নামার পাশাপাশি রক্ষণভাগের অন্য খেলোয়াড়রা নিয়মিত কভারিং দিয়ে যান, যাতে তাঁর জন্য কোনো খালি জায়গা তৈরি না হয়।
যদিও সেই ম্যাচে হলান্ড গোল করতে পারেননি, ম্যানচেস্টার সিটি অন্য পথ খুঁজে নেয়। ৩-৩ গোলে শেষ হওয়া ম্যাচে বার্নার্দো সিলভা, ফিল ফোডেন ও যোস্কো গভার্দিওল গোল করেন। অর্থাৎ হলান্ডকে থামানো গেলেও পুরো দলকে থামানো কতটা কঠিন, সেটিও স্পষ্ট হয়ে যায়।
রুডিগার পরে হলান্ড সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বর্তমান ফুটবলে শারীরিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী স্ট্রাইকারদের একজন হলান্ড। তবে তিনি মূলত সতীর্থদের কাছ থেকে ভালো পাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেই সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারলেই তাঁকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয় লেগেও আনচেলত্তি একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করেন। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টাইমস-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রিয়াল মাদ্রিদ সেদিন নিচু রক্ষণ বা ‘লো-ব্লক’ কৌশলে খেলেছিল। ডি-বক্সের সামনে ঘন রক্ষণ গড়ে তুলে হলান্ডকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল।
ম্যাচটি ১-১ গোলে শেষ হলেও টাইব্রেকারে জয় তুলে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি পুরো কৃতিত্ব দেন নিজের রক্ষণভাগকে। তাঁর মতে, প্রথম লেগে হলান্ডকে নিষ্ক্রিয় রাখার পেছনে ডিফেন্ডারদের সম্মিলিত বোঝাপড়াই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।
তবে এই গল্পের শেষটা একেবারে একপেশে নয়। ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ প্লে-অফে অবশেষে আনচেলত্তির দলের বিপক্ষে জোড়া গোল করেন হলান্ড। যদিও একটি ছিল পেনাল্টি থেকে, তারপরও দীর্ঘ সময়ের গোলখরা কাটিয়ে তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। তবে দ্বিতীয় লেগে চোটের কারণে খেলতে না পারায় শেষ পর্যন্ত সুবিধা পায় রিয়াল মাদ্রিদই।
এবার সেই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়েই বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল। রুডিগারের মতো কোনো নির্দিষ্ট ডিফেন্ডারের বদলে পুরো রক্ষণভাগকে নিয়েই আবারও হলান্ডকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা দেখা যেতে পারে আনচেলত্তির কাছ থেকে। তাঁর বিশ্বাস, একজন নয়, বরং দলগত শৃঙ্খলা আর সঠিক অবস্থানই হতে পারে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর এই স্ট্রাইকারকে থামানোর সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।




























