ভারতের কাছে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। একই সঙ্গে তার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এই বিষয়টি আবারও আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকে।বুধবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এ অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেন। এতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল দিক সামনে আসে।
বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির সঙ্গে আলোচনা করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে পৃথক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, এসব বৈঠকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ ছাড়াও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহও বৈঠকে অংশ নেন। এতে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়। আলোচনায় উভয় পক্ষই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে। অর্থনীতি, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে। এই নীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং লাভের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকে শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড নিয়েও আলোচনা হয়। এ ঘটনায় সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারে সহযোগিতা করায় ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানায় বাংলাদেশ। এটি দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে বলে জানানো হয়। এতে ভবিষ্যতে অপরাধ দমনে সহযোগিতা আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতীয় পক্ষ জানায়, বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা সেবা আরও সহজ করা হবে। বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যারা ভারতে যান, তাদের জন্য প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভিসা সহজীকরণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং চিকিৎসা সেবায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের সাম্প্রতিক ডিজেল সরবরাহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ডিজেল ও সার রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ জানান। ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেন। তিনি বলেন, বিষয়টি সরকার গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে। এতে ভবিষ্যতে জ্বালানি সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও আলোচনা হয়। উভয় দেশই শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে। প্রত্যর্পণ ইস্যু সংবেদনশীল হলেও, অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক এই বৈঠক সেই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, দিল্লির এই বৈঠকে প্রত্যর্পণ ইস্যু ছাড়াও বহুমাত্রিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলেই আশা করা হচ্ছে।





















