জব্বারের বলীখেলা শুধু একটি কুস্তি প্রতিযোগিতা নয়, এটি চট্টগ্রামের গৌরব, ঐতিহ্য এবং সাহসিকতার প্রতীক। বছরের পর বছর ধরে এই প্রতিযোগিতা শক্তি, দক্ষতা ও মনোবলের এক অনন্য উৎসব হিসেবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। চট্টগ্রামের নাম উচ্চারিত হলে যে কয়েকটি ঐতিহ্যের কথা সবার আগে মনে আসে, তার মধ্যে জব্বারের বলীখেলা অন্যতম।
এই ঐতিহ্যের সূচনা ১৯০৯ সালে। চট্টগ্রামের সমাজসেবক আব্দুল জব্বার সওদাগর তরুণদের শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও সাহসী করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই বলীখেলার আয়োজন শুরু করেন। তখন ব্রিটিশ শাসনের সময় ছিল, আর যুবকদের আত্মবিশ্বাস ও শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি জনপ্রিয় লোকজ উৎসবে পরিণত হয়।
প্রতি বছর বাংলা বৈশাখ মাসে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় জব্বারের বলীখেলা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বলী বা কুস্তিগিররা এখানে অংশ নিতে আসেন। শুধু প্রতিযোগিতাই নয়, এই আয়োজনকে ঘিরে বসে বৈশাখী মেলা, যেখানে হাজারো মানুষ ঐতিহ্যবাহী পণ্য, হস্তশিল্প এবং স্থানীয় খাবারের স্বাদ উপভোগ করেন।
‘বলী’ শব্দের অর্থ শক্তিশালী ব্যক্তি। তাই জব্বারের বলীখেলা মূলত শক্তি, কৌশল এবং ধৈর্যের লড়াই। প্রতিযোগীরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কুস্তি লড়েন। এখানে জয়ী হতে শুধু শারীরিক শক্তিই নয়, প্রয়োজন বুদ্ধি, ভারসাম্য এবং দীর্ঘ অনুশীলন।
চট্টগ্রামের মানুষের কাছে এই বলীখেলা কেবল একটি খেলা নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক উৎসব। ছোট-বড় সবাই এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন। অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই খেলা দেখতে আসছেন। ফলে এটি মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।
জব্বারের বলীখেলা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কুস্তিগিরদের একত্রিত করে। অভিজ্ঞ বলীদের পাশাপাশি নতুন প্রতিযোগীরাও নিজেদের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ পান। এতে দেশীয় কুস্তি চর্চা টিকে থাকার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মও এই খেলার প্রতি আগ্রহী হচ্ছে।
বলীখেলার পাশাপাশি লালদীঘির বৈশাখী মেলা এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। মেলায় বাঁশ ও কাঠের তৈরি সামগ্রী, মাটির পণ্য, খেলনা, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং নানা ধরনের লোকজ পণ্যের সমারোহ দেখা যায়। ফলে দর্শনার্থীরা একসঙ্গে খেলা ও উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।
বর্তমানে আধুনিক খেলাধুলার জনপ্রিয়তা বাড়লেও জব্বারের বলীখেলা তার স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। প্রতিবছর হাজারো দর্শক সরাসরি মাঠে উপস্থিত হন। এছাড়া টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের মানুষও এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা দেখতে পান।
সংস্কৃতিবিদদের মতে, জব্বারের বলীখেলা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকজ ক্রীড়া ঐতিহ্য। এটি শুধু চট্টগ্রামের নয়, পুরো দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। তাই এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।
পর্যটনের ক্ষেত্রেও এই আয়োজনের গুরুত্ব অনেক। বৈশাখের সময় দেশ-বিদেশের পর্যটকরা চট্টগ্রামে এসে বলীখেলা ও বৈশাখী মেলার অভিজ্ঞতা নিতে চান। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও চাঙা হয়ে ওঠে এবং চট্টগ্রামের ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও পরিচিতি পায়।
আজকের ডিজিটাল যুগেও জব্বারের বলীখেলা তার জনপ্রিয়তা হারায়নি। বরং অনলাইন ভিডিও, ছবি এবং তথ্যচিত্রের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারছে। এতে ভবিষ্যতেও এই শতবর্ষী উৎসব টিকে থাকার সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রা বুঝতে চাইলে জব্বারের বলীখেলা সম্পর্কে জানা জরুরি। কারণ এটি শুধু শক্তির প্রতিযোগিতা নয়, বরং ঐক্য, সাহস, ঐতিহ্য এবং বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতীক। শত বছরের বেশি সময় ধরে এই আয়োজন প্রমাণ করে আসছে, ঐতিহ্য কখনও পুরোনো হয় না, বরং সময়ের সঙ্গে আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে।


























