চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতিতে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। ভ্যাট আদায়ে বড় পতন এবং কাস্টমসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় অর্থবছরের শুরুতেই চাপে পড়েছে সংস্থাটি।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে সংস্থাটির রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রথম তিন মাসে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। ফলে বাকি নয় মাসে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য রাজস্ব আদায়ে গতি বাড়ানো প্রয়োজন।
ভ্যাট আদায়ের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৬ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৮ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। এতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে ভ্যাট আদায় হয়েছিল ৩৩ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আদায় কমেছে ৫ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।
এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমান জানান, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা কম ভ্যাট এসেছে। এ ছাড়া কয়েকটি খাতে আদায় কম হওয়ায় সামগ্রিক পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়েছে। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ভ্যাট আদায় বাড়বে বলে আশাবাদ জানিয়েছেন তিনি।
মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোর মধ্যে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ভ্যাটে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। প্রথম তিন মাসে এ ইউনিটের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ ইউনিটে আদায়ও কমেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম চালুর প্রভাব আদায়ে পড়তে পারে। আগে প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দেওয়ায় সরকার নিয়মিত ভ্যাট পেত। নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা তিন মাস পর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আদায় কম হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা।
এনবিআরের সাবেক সদস্য (ভ্যাট নীতি) ড. আব্দুর রউফ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আদায়ে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় ভ্যাট আদায় বাড়ার কথা থাকলেও এবার প্রথম তিন মাসে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। পর্যাপ্ত সমীক্ষা ছাড়া রিটার্ন জমার সময়সীমা পরিবর্তন এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ব্যবসায়ীরা অন্যান্য আর্থিক দায় মেটানোকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় ভ্যাট জমায় প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ে শুল্ক ও কর আদায়েও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। প্রথম তিন মাসে এ খাতে আদায় হয়েছে ৩০ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ হলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, আয়কর আদায়ে তুলনামূলক ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। এ সময়ে আয়কর আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি। তবে আয়করের প্রবৃদ্ধি ভ্যাট ও কাস্টমসের ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট হয়নি।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ঘন ঘন বদলি এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের অভাবও রাজস্ব আদায়ে বাধা সৃষ্টি করছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও বাজেট বাস্তবায়নে চাপ বাড়তে পারে। তাই কর ফাঁকি প্রতিরোধ, নিয়মিত তদারকি এবং ভ্যাট আদায়ে গতি ফেরানো এখন সংস্থাটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন