অমর জেলিফিশ নামে পরিচিত টুরিটপসিস ডোরনি এমন এক সামুদ্রিক প্রাণী, যে বিপদের মুখে নিজের জীবনচক্রকে উল্টো দিকে ফিরিয়ে নিতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় পৌঁছানোর পরও এই ক্ষুদ্র স্বচ্ছ জেলিফিশ আবার জীবনের আগের পর্যায়ে ফিরে যেতে সক্ষম। বিজ্ঞানীদের কাছে প্রাণীটির এই অসাধারণ ক্ষমতা এখন বার্ধক্য ও বয়সজনিত রোগ নিয়ে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।
টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি অ্যাট গ্যালভেস্টনের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী মারিয়া মিগলিয়েত্তা দীর্ঘদিন ধরে এই প্রাণী নিয়ে কাজ করছেন। গবেষণাগারে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও টুরিটপসিস ডোরনির আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। প্রাণীটিকে কেটে দেওয়া, খাবার না দেওয়া, পানিতে অতিরিক্ত লবণ দেওয়া কিংবা মিঠা পানিতে রাখার মতো পরিস্থিতির পরও দেখা গেছে, এটি সাধারণভাবে মৃত্যুর দিকে না গিয়ে নিজের জীবনচক্র পরিবর্তনের চেষ্টা করে।
প্রতিকূল অবস্থায় প্রাপ্তবয়স্ক জেলিফিশটি প্রথমে স্থির হয়ে যায় এবং ট্যাংকের তলায় পড়ে থাকে। এরপর এর শরীরে ঘটে এক বিস্ময়কর পরিবর্তন। প্রাণীটি এমন একটি কোষের পিণ্ডে পরিণত হয়, যার সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক জেলিফিশের পরিচিত ছাতার মতো শরীর বা শুঁড়ের কোনো মিল থাকে না। এক থেকে তিন দিনের মধ্যে ওই কোষের পিণ্ড থেকে পলিপ তৈরি হয়। পলিপ হলো জেলিফিশের জীবনচক্রের একটি প্রাথমিক পর্যায়।
পরবর্তী সময়ে এই পলিপ থেকে একটি কলোনি তৈরি হতে পারে এবং সেই কলোনি থেকে আবার নতুন জেলিফিশ জন্ম নেয়। অর্থাৎ একটি প্রাপ্তবয়স্ক জেলিফিশ এমন একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, যার ফলে তার জীবনচক্র আবার শুরুর দিকে ফিরে যায়। নতুন জেলিফিশগুলোও একইভাবে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
এই কারণেই টুরিটপসিস ডোরনিকে অমর জেলিফিশ বলা হয়। বিজ্ঞানীদের জানা তথ্য অনুযায়ী, প্রাণীজগতে এমনভাবে প্রাপ্তবয়স্ক শরীরকে আগের জীবনপর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা অত্যন্ত বিরল। কিছু টিকটিকি, কৃমি ও উভচর প্রাণী শরীরের হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনরায় তৈরি করতে পারে। কিন্তু টুরিটপসিস ডোরনির মতো পুরো জীবনচক্রকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনা তাদের মধ্যে দেখা যায় না।
এই অস্বাভাবিক ক্ষমতার রহস্য খুঁজতে বিজ্ঞানীরা এখন প্রাণীটির জিন ও কোষীয় প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করছেন। তাদের অন্যতম লক্ষ্য হলো এমন কোনো আণবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা খুঁজে বের করা, যা কোষকে আবার তুলনামূলক তরুণ অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সাহায্য করে।
গবেষণার শুরুটা অবশ্য আরও কয়েক দশক আগে। ১৯৯২ সালে ইতালির এক বিজ্ঞানী গবেষণাগারে জেলিফিশগুলো রেখে সপ্তাহান্তে তাদের খাবার দিতে ভুলে যান। ফিরে এসে তিনি প্রাণীগুলোকে মৃত অবস্থায় পাওয়ার আশা করেছিলেন। কিন্তু সেখানে নতুন পলিপ দেখতে পান। ঘটনাটি থেকেই টুরিটপসিস ডোরনির জীবনচক্র নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ আরও বাড়তে থাকে।
ইতালির ইউনিভার্সিটি অব সালেন্তোর জীববিজ্ঞানী স্তেফানো পিরাইনো পরে এই পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি দেখতে পান, জেলিফিশের কিছু পরিণত কোষ তাদের নির্দিষ্ট পরিচয় হারিয়ে আবার এমন অবস্থায় ফিরে যেতে পারে, যেখান থেকে ভিন্ন ধরনের কোষ তৈরি করা সম্ভব। এই প্রক্রিয়াকে ট্রান্সডিফারেনশিয়েশন বলা হয়।
সহজভাবে বললে, শরীরের একটি নির্দিষ্ট ধরনের পরিণত কোষ আবার এমন অবস্থায় ফিরে যায়, যেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য ধরনের কোষ তৈরি হতে পারে। টুরিটপসিস ডোরনির জীবনচক্র উল্টে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন গবেষকেরা।
এই প্রাণীর জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়েও ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় টুরিটপসিস ডোরনির জিনকে এমন একটি ঘনিষ্ঠ প্রজাতির সঙ্গে তুলনা করা হয়, যেটি পুনরুজ্জীবিত হওয়ার জন্য পরিচিত নয়। গবেষণায় দেখা যায়, অমর জেলিফিশের ডিএনএ ক্ষতি ও মিউটেশন মেরামতের সঙ্গে যুক্ত কিছু জিনের অতিরিক্ত কপি রয়েছে।
এ ছাড়া টেলোমিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত জিনেরও বেশি কপি পাওয়া গেছে। টেলোমিয়ার হলো ডিএনএর প্রান্তে থাকা সুরক্ষামূলক অংশ, যা জিনগত উপাদানকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। মানুষের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে টেলোমিয়ার সাধারণত ছোট হতে থাকে। অমর জেলিফিশের টেলোমিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা তার দীর্ঘস্থায়ী জীবনচক্রের একটি কারণ হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
তবে এই গবেষণার উদ্দেশ্য মানুষকে আক্ষরিক অর্থে আবার শিশুতে পরিণত করা নয়। বিজ্ঞানীরা এমন কোনো কল্পবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কথা বলছেন না, যাতে একজন বয়স্ক মানুষ হঠাৎ তরুণ হয়ে যাবেন। বরং লক্ষ্য হলো কোষ ও টিস্যুকে কিছুটা তরুণ অবস্থায় ফিরিয়ে এনে ক্ষত সারানো কিংবা বয়সজনিত রোগের ক্ষতি কমানোর সম্ভাবনা খুঁজে দেখা।
গবেষকদের আশা, টুরিটপসিস ডোরনির কোষীয় প্রক্রিয়া আরও ভালোভাবে বোঝা গেলে ভবিষ্যতে স্ট্রোক বা হৃদ্রোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু পুনরুদ্ধার, বয়সজনিত দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি কিংবা আলঝেইমার রোগের মতো স্নায়ু ক্ষয়জনিত সমস্যার চিকিৎসায় নতুন পথ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং মানুষের চিকিৎসায় প্রয়োগের জন্য অনেক দূর যেতে হবে।
মিগলিয়েত্তা ও তার সহকর্মীরা টুরিটপসিস ডোরনির জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে কোন জিন সক্রিয় হয়, তা পর্যবেক্ষণ করছেন। বিশেষ করে যে পর্যায়ে প্রাণীটি কোষের বলের মতো অবস্থায় ফিরে যায়, সেই সময় সক্রিয় হওয়া জিনগুলো নিয়ে তাদের আগ্রহ বেশি। গবেষণায় ডিএনএ মেরামত ও টেলোমিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত জিনের সক্রিয়তার পাশাপাশি এমন কিছু জিনেরও সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের কাজ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
আরও একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, জেলিফিশটির পুনরুজ্জীবনের সময় অতিরিক্ত সক্রিয় হওয়া কিছু জিনের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জিনের মিল রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে একই প্রক্রিয়া সরাসরি মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা সম্ভব। তবে দুই প্রজাতির মধ্যে কিছু সাধারণ জৈবিক পথ থাকতে পারে, যা ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
তবে অমর জেলিফিশকে পুরোপুরি অমর ভাবারও কারণ নেই। গবেষণাগারে এমন কিছু প্রাণী দেখা যায়, যারা পুনরুজ্জীবিত হতে পারে না। যারা এই প্রক্রিয়ায় সক্ষম, তাদেরও কতবার পর্যন্ত জীবনচক্র ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকে, তার নির্দিষ্ট সীমা আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
প্রকৃতিতেও এই প্রাণীদের জন্য নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। খাবার হিসেবে প্রয়োজনীয় প্ল্যাঙ্কটনের প্রাপ্যতা পরিবর্তিত হওয়া, শিকারি প্রাণীর আক্রমণ কিংবা শৈবালের কারণে জেলিফিশের কলোনি ঢেকে যাওয়ার মতো কারণে তারা মারা যেতে পারে। গবেষণাগারেও দীর্ঘ সময় ধরে এদের বাঁচিয়ে রাখা কঠিন এবং নির্দিষ্ট পরিবেশগত শর্ত প্রয়োজন হয়।
তাই অমর জেলিফিশের রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তবে একটি ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী কীভাবে বয়সের স্বাভাবিক ধারাকে পেছনে ফেলে আবার জীবনচক্রের শুরুতে ফিরতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বার্ধক্য, কোষের ক্ষয় এবং পুনর্জন্ম সম্পর্কে নতুন ধারণা পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে এই গবেষণা মানব কোষ ও টিস্যুকে আরও কার্যকরভাবে পুনরুদ্ধারের কোনো পথ দেখাতে পারে কি না, সেটিই এখন বিজ্ঞানীদের অন্যতম আগ্রহের বিষয়।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন