সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু শাসন করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ধৈর্য, ভালোবাসা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। জাপানে শিশুদের শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচার শেখানোর ক্ষেত্রে এমনই একটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যার নাম ‘শিৎসুকে’। জাপানি সংস্কৃতিতে এই পদ্ধতির মূল ধারণা হলো আত্মশৃঙ্খলা। বকাঝকা বা কঠোর শাস্তির পরিবর্তে শিশুদের ধীরে ধীরে নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং দায়িত্বশীল হতে শেখানো হয়। এই পদ্ধতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক মা-বাবারাও সন্তান লালন-পালনে কাজে লাগাতে পারেন।
১. নিজের আচরণ দিয়ে শিশুকে শেখান
শিশুরা আশপাশের মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে অনেক কিছু শেখে। বিশেষ করে মা-বাবার আচরণ তাদের ব্যক্তিত্ব ও অভ্যাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সন্তানকে শান্ত, বিনয়ী ও ধৈর্যশীল হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে অভিভাবকদেরও নিজেদের আচরণের দিকে নজর দিতে হবে।
যেমন, সন্তান যদি রাগের সময় চিৎকার না করুক বলে চান, তাহলে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। কোনো পরিস্থিতিতে বিরক্ত হলেও শিশুর সামনে চেঁচামেচি বা অপমানজনক আচরণ না করাই ভালো। কারণ, শিশুরা বড়দের আচরণ অনুকরণ করতে পারে।
সন্তান ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে রেগে গিয়ে বকাঝকা না করে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাকে কাছে ডেকে বুঝিয়ে বলুন, কোথায় ভুল হয়েছে এবং সেই আচরণের কী পরিণতি হতে পারে। এতে শিশু ভয় পাওয়ার পরিবর্তে নিজের ভুল বুঝতে ও তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
২. স্পষ্ট নিয়ম তৈরি করুন এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন
শিশুর দৈনন্দিন জীবনে নির্দিষ্ট নিয়ম ও রুটিন থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমানোর সময়, খাওয়ার নিয়ম, পড়াশোনার সময় এবং মোবাইল ব্যবহারের সীমা আগে থেকে নির্ধারণ করা থাকলে শিশু বুঝতে পারে কখন কী করতে হবে।
অনেক সময় অভিভাবকেরা পরিস্থিতি অনুযায়ী একই নিয়ম বারবার পরিবর্তন করেন। কোনো দিন একটি আচরণে বাধা দেওয়া হয়, আবার অন্য দিন সেটিই মেনে নেওয়া হয়। এতে শিশু বিভ্রান্ত হতে পারে এবং নিয়ম মানতে অনীহা দেখাতে পারে।
জাপানি শিৎসুকে পদ্ধতিতে নিয়মিত অভ্যাস ও আত্মশৃঙ্খলা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই সন্তানকে সহজ ভাষায় নিয়মগুলো বুঝিয়ে বলুন এবং নিজেরাও সেগুলো মেনে চলুন।
উদাহরণস্বরূপ, ঘুমানোর নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন, খাওয়ার সময় মোবাইল ফোন সরিয়ে রাখুন এবং খেলাধুলার পর খেলনা গুছিয়ে রাখার অভ্যাস শেখান। নিয়ম ভাঙলে রাগ না করে কেন নিয়মটি প্রয়োজন, তা বুঝিয়ে দিন। ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে শিশু ধীরে ধীরে নিজের দায়িত্ব বুঝতে শিখবে।
৩. দুষ্টুমিকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখুন
শিশুদের জেদ করা, কান্নাকাটি করা কিংবা অন্যের সঙ্গে খেলনা নিয়ে ঝগড়া করা বড় হওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। এসব আচরণের জন্য শুধু বকাঝকা বা শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে কেন এমন হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
শিৎসুকে পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিশুর ভুলকে শুধুই অপরাধ হিসেবে না দেখে প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানোর সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা।
ধরুন, কোনো খেলনা না পেয়ে সন্তান কান্নাকাটি করছে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে চুপ করানোর জন্য ধমক না দিয়ে নিজের হতাশা কীভাবে সামলাতে হয়, তা শেখান। বলতে পারেন, ‘তুমি মন খারাপ করেছ, আমি বুঝতে পারছি। চলো, একটু শান্ত হয়ে কথা বলি।’
আবার অন্য শিশুর সঙ্গে খেলনা ভাগাভাগি করতে গিয়ে সমস্যা হলে তাকে অপেক্ষা করতে ও নিজের পালার জন্য ধৈর্য ধরতে শেখান। এতে শিশু শুধু কোন কাজটি করা উচিত নয়, বরং তার পরিবর্তে কীভাবে আচরণ করতে হবে, সেটিও বুঝতে পারবে।
শিশুর বয়স ও বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী সহজ ভাষায় নির্দেশনা দিন। একবার বুঝিয়ে বললেই যে আচরণ বদলে যাবে, এমন প্রত্যাশা না রেখে ধৈর্য ধরে একই শিক্ষা বারবার দিন।
শাসনের চেয়ে শেখানো কেন গুরুত্বপূর্ণ
সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উদ্দেশ্য শুধু শিশুকে বাধ্য করা নয়, বরং তাকে নিজের আচরণ বুঝতে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো। এজন্য শিশুর ভুলের প্রতিক্রিয়ায় কীভাবে আচরণ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
জাপানি শিৎসুকে পদ্ধতির এই তিনটি দিক থেকে অভিভাবকেরা একটি বিষয় শিখতে পারেন—শিশুর সামনে ভালো উদাহরণ তৈরি করা, নিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ভুলের সময় প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানো।
তবে প্রতিটি শিশুর স্বভাব, বয়স ও শেখার ধরন আলাদা। তাই কোনো একটি পদ্ধতি সব শিশুর ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সন্তানের প্রয়োজন বুঝে ভালোবাসা, ধৈর্য ও উপযুক্ত দিকনির্দেশনার সমন্বয় করাই হতে পারে ইতিবাচক অভিভাবকত্বের কার্যকর উপায়।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন