বিয়ের জন্য উপযুক্ত দ্বীনদার পাত্র না পেলে সারাজীবন অবিবাহিত থাকা যাবে কি না, এ নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। ইসলামে বিয়েকে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে শুধু বিয়ে করার জন্য নিজের নিরাপত্তা, মানসিক শান্তি ও মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করারও প্রয়োজন নেই। পাত্রের দ্বীনদারি, নৈতিক চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নূরের ৩২ নম্বর আয়াতে অবিবাহিত নারী-পুরুষের বিয়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আয়াতটিতে বলা হয়েছে, তাঁরা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাঁদের সচ্ছল করে দিতে পারেন। এ আয়াত থেকে বিয়ের প্রতি ইসলামের উৎসাহ এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা পাওয়া যায়।
বিয়ের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর কথাও উল্লেখ করা হয়। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজা রাখতেন, আবার রোজা থেকে বিরতও থাকতেন; নামাজ আদায় করতেন, বিশ্রাম নিতেন এবং বিবাহও করেছিলেন। তিনি নিজের সুন্নাহ থেকে বিমুখ হওয়াকে নিরুৎসাহিত করেছেন। হাদিসটি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
এ ছাড়া সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে উসমান ইবনে মাজউন (রা.)-এর চিরকুমার থাকার প্রবণতাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) অনুমোদন করেননি বলে উল্লেখ রয়েছে। এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ইবাদতের নামে বিবাহিত জীবনকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করাকে ইসলাম উৎসাহিত করে না। তবে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা না করে সবার জন্য একই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়।
পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ইসলাম দ্বীনদারি ও চরিত্রকে গুরুত্ব দিয়েছে। জামে তিরমিজি ও সুনান ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হাদিসে পাত্রের দ্বীন ও চরিত্রে সন্তুষ্ট হলে বিয়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতা নয়, বরং বিশ্বাস, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং ইসলামের মৌলিক বিধান পালনের আন্তরিকতাও বিবেচনা করা জরুরি।
কেউ আলেম নন বা তাঁর দ্বীনি জ্ঞান খুব গভীর নয় শুধু এ কারণে তাঁকে বিয়ের অনুপযুক্ত মনে করা ঠিক নয়। তাঁর আকিদা সঠিক, চরিত্র ভালো এবং ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা থাকলে তাঁকে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সহযোগিতা করে ধর্মীয় জ্ঞান ও আমল বাড়ানোর সুযোগও পান।
তবে কোনো পাত্রের মধ্যে নির্যাতনমূলক আচরণ, গুরুতর নৈতিক সমস্যা, ধর্মীয় বিধানের প্রতি অবজ্ঞা কিংবা দায়িত্বহীনতা থাকলে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। শুধু সামাজিক চাপ বা বয়সের কারণে তাড়াহুড়া করে বিয়ে করাও সমীচীন নয়। পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তা ও মানসিক সামঞ্জস্য দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইসলামে বিয়ের বিধান ব্যক্তির অবস্থা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কারও জন্য বিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা জরুরি হতে পারে, আবার অন্য কারও ক্ষেত্রে অবিবাহিত থাকা নিষিদ্ধ নাও হতে পারে। তাই উপযুক্ত পাত্র না পেলে বিয়ে পিছিয়ে দেওয়া বা অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্তের শরয়ি বিধান নির্ধারণে ব্যক্তির অবস্থা, উদ্দেশ্য ও গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সুতরাং, শুধু উচ্চমাত্রার দ্বীনি জ্ঞানসম্পন্ন পাত্র না পাওয়ার কারণে আজীবন অবিবাহিত থাকতেই হবে এমন কোনো সর্বজনীন নির্দেশনা নেই। একইভাবে যেকোনো ব্যক্তিকে বিয়ে করাও বাধ্যতামূলক নয়। নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্বীন, চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে সঠিক শরয়ি নির্দেশনা পেতে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন