ঢাকা ০৩:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ৯ নম্বর কে, আলভারেজ নাকি মার্তিনেজ

হুলিয়ান আলভারেজ ও লাওতারো মার্তিনেজ

বিশ্বকাপের আর বেশি দিন বাকি নেই। এরই মধ্যে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—মূল একাদশে স্ট্রাইকার হিসেবে কার ওপর ভরসা করবেন কোচ লিওনেল স্কালোনি? হুলিয়ান আলভারেজ নাকি লাওতারো মার্তিনেজ? দুই তারকার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে নির্বাচনটা এখন আর্জেন্টিনা কোচিং স্টাফের জন্য এক সুখকর মাথাব্যথায় পরিণত হয়েছে।

আগামী শনিবার হন্ডুরাসের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। তবে চোটের কারণে এই ম্যাচে হুলিয়ান আলভারেজকে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শুরু থেকেই আক্রমণভাগে লাওতারো মার্তিনেজকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে স্কালোনির প্রথম পছন্দ কে হবেন, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

কাতার বিশ্বকাপের শুরুতে আর্জেন্টিনার প্রধান স্ট্রাইকার ছিলেন লাওতারো মার্তিনেজ। তবে গ্রুপ পর্বে মেক্সিকোর বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ জয়ের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। সেই ম্যাচের পর থেকেই একাদশে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে ফেলেন হুলিয়ান আলভারেজ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক এই ফরোয়ার্ডকে।

আলভারেজের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর গতি এবং নিরলস প্রেসিং। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ কার্যকর। আধুনিক ফুটবলে একজন ফরোয়ার্ডের কাছ থেকে যে ধরনের পরিশ্রম ও তৎপরতা প্রত্যাশা করা হয়, আলভারেজ তা নিয়মিতভাবে করে দেখিয়েছেন।

বিশেষ করে লিওনেল মেসির সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছিল। মেসির কাছাকাছি থেকে খেলে সুযোগ তৈরি করা এবং দ্রুত ফিনিশিংয়ে দক্ষতা দেখিয়ে আলভারেজ কোচের আস্থা অর্জন করেন। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই বোঝাপড়া দলের জন্য বড় সম্পদ হয়ে ওঠে।

কাতার বিশ্বকাপে আলভারেজের অবদান ছিল অসাধারণ। পোল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করে দলকে জয় এনে দেন তিনি। এরপর শেষ ষোলোতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও গোল পান। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি নিজেকে দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তাঁর জোড়া গোল এখনো আর্জেন্টিনা সমর্থকদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। সেই ম্যাচে তাঁর গতি, ফিনিশিং এবং আত্মবিশ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথে আলভারেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

অন্যদিকে লাওতারো মার্তিনেজও কখনোই আর্জেন্টিনা দলের পরিকল্পনার বাইরে ছিলেন না। বিশ্বকাপ জয়ের পর বিভিন্ন ম্যাচে তাঁকে পর্যাপ্ত সুযোগ দিয়েছেন স্কালোনি। এমনকি কিছু ম্যাচে আলভারেজ ও মার্তিনেজকে একসঙ্গে আক্রমণভাগে খেলিয়েছেন তিনি।

বিশেষ করে যখন মেসি দলের বাইরে ছিলেন, তখন দুই স্ট্রাইকারকে একসঙ্গে ব্যবহার করার কৌশল দেখা গেছে। এতে আর্জেন্টিনার আক্রমণে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছিল। তবে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে একজন কেন্দ্রীয় স্ট্রাইকারকেই বেছে নিয়েছেন স্কালোনি।

২০২৪ কোপা আমেরিকার পরিসংখ্যান মার্তিনেজের পক্ষে কথা বলে। পুরো টুর্নামেন্টে ৫ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন তিনি। মজার বিষয় হলো, আর্জেন্টিনার ছয় ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুটি ম্যাচে প্রথম একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন এই ফরোয়ার্ড।

পেরুর বিপক্ষে ম্যাচে স্কালোনি দ্বিতীয় সারির দল খেলিয়েছিলেন এবং সেখানে মার্তিনেজ একাদশে ছিলেন। পরে কোয়ার্টার ফাইনালে ইকুয়েডরের বিপক্ষেও সুযোগ পান তিনি। সীমিত সুযোগ পেয়েও নিজের গোল করার সামর্থ্যের প্রমাণ দেন ইন্টার মিলানের এই তারকা।

অন্যদিকে আলভারেজ তুলনামূলক বেশি সময় মাঠে ছিলেন। কানাডার বিপক্ষে দুটি গোল করে দলকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কোচের পরিকল্পনায় তিনি যে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছেন, সেটিরও প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর খেলার মিনিটে।

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের দ্বিতীয় ধাপে লিওনেল মেসির অনুপস্থিতি আর্জেন্টিনার কৌশলে কিছু পরিবর্তন আনে। মেসি চোটের কারণে একাধিক ম্যাচে খেলতে পারেননি। ফলে দলের আক্রমণ গঠনে মিডফিল্ডারদের দায়িত্বও বেড়ে যায়।

এই সময়ে লিয়ান্দ্রো পারেদেস মাঝমাঠে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন। পাশাপাশি থিয়াগো আলমাদা ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন। ফলে আক্রমণে সাধারণত একজন স্ট্রাইকারের জন্যই জায়গা তৈরি হয়।

সে জায়গায় বেশিরভাগ সময়ই খেলেছেন হুলিয়ান আলভারেজ। স্কালোনি তাঁর পরিশ্রম, গতিশীলতা এবং ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলার ওপর ভরসা রেখেছেন। এতে বোঝা যায়, কোচের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আলভারেজের গুরুত্ব কতটা।

মার্তিনেজের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চোট। পেশির সমস্যার কারণে তিনি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে উরুগুয়ে ও ব্রাজিলের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ম্যাচ খেলতে পারেননি। দলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুপস্থিত থাকাটা তাঁর জন্য অবশ্যই হতাশার বিষয়।

চিলি ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের জন্য দলে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ হয়নি মার্তিনেজের। শারীরিক অবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না থাকায় কোচিং স্টাফ তাঁকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাননি। ফলে প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়েও পড়েন তিনি।

চলতি বছরও প্রীতি ম্যাচগুলোতে মার্তিনেজকে পাওয়া যায়নি। একই চোটের কারণে ইন্টার মিলানের মৌসুমের শেষ অংশেও উল্লেখযোগ্য সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। তবু মাঠে নামলে তাঁর কার্যকারিতা ছিল প্রশংসনীয়।

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪১ ম্যাচে ২২ গোল করেছেন মার্তিনেজ। পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৬টি গোল। একজন স্ট্রাইকার হিসেবে এই পরিসংখ্যান তাঁর ধারাবাহিকতারই প্রমাণ দেয়।

অন্যদিকে ‘দ্য স্পাইডার’ খ্যাত হুলিয়ান আলভারেজও কাটিয়েছেন সফল মৌসুম। আতলেতিকো মাদ্রিদ বড় কোনো শিরোপা না জিতলেও দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৯ ম্যাচে ২০ গোল করেছেন আলভারেজ। পাশাপাশি ৯টি গোলে সহায়তা করেছেন। বিশেষ করে চ্যাম্পিয়নস লিগে তাঁর গোল করার দক্ষতা প্রশংসা কুড়িয়েছে ফুটবল বিশ্লেষকদের।

যদিও নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় গোলশূন্য ছিলেন তিনি। তবে সেই কঠিন সময় কাটিয়ে মৌসুমের শেষভাগে আবারও নিজের ছন্দ ফিরে পান। এতে তাঁর মানসিক দৃঢ়তারও পরিচয় পাওয়া যায়।

মৌসুমের শেষ দিকে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে বাঁ পায়ের গোড়ালিতে গুরুতর চোট পান আলভারেজ। তবুও ব্যথানাশক ওষুধের সাহায্যে ফিরতি লেগে খেলেন তিনি। পরে অবশ্য লা লিগার বাকি অংশ গ্যালারি থেকে দেখতে হয়েছে।

তবে বিশ্বকাপ সামনে রেখে আশার খবর হলো, আলভারেজ ইতোমধ্যে অনুশীলনে ফিরেছেন। সতীর্থদের সঙ্গে নিয়মিত প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তাই বিশ্বকাপের আগে তাঁর ফিটনেস নিয়ে বড় কোনো শঙ্কা নেই।

হন্ডুরাসের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে শারীরিকভাবে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকায় লাওতারো মার্তিনেজের শুরু করার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু সেটি বিশ্বকাপের মূল একাদশের চিত্র নির্ধারণ করে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

সবকিছু বিবেচনায় নিলে পুরোপুরি ফিট অবস্থায় স্কালোনির প্রথম পছন্দ হিসেবে এখনো হুলিয়ান আলভারেজ কিছুটা এগিয়ে আছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। তাঁর গতিশীলতা, প্রেসিং এবং মেসির সঙ্গে বোঝাপড়া তাঁকে বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে।

তবে লাওতারো মার্তিনেজও যে সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন, সেটি তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে। গোল করার দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা তাঁকে সমানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রেখেছে। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ৯ নম্বর জার্সিতে বিশ্বকাপের বড় ম্যাচগুলোতে কে শুরু করবেন, সেই উত্তর মিলবে সময়ের হাত ধরেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ৯ নম্বর কে, আলভারেজ নাকি মার্তিনেজ

Update Time : ০৩:০৮:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

বিশ্বকাপের আর বেশি দিন বাকি নেই। এরই মধ্যে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—মূল একাদশে স্ট্রাইকার হিসেবে কার ওপর ভরসা করবেন কোচ লিওনেল স্কালোনি? হুলিয়ান আলভারেজ নাকি লাওতারো মার্তিনেজ? দুই তারকার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে নির্বাচনটা এখন আর্জেন্টিনা কোচিং স্টাফের জন্য এক সুখকর মাথাব্যথায় পরিণত হয়েছে।

আগামী শনিবার হন্ডুরাসের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। তবে চোটের কারণে এই ম্যাচে হুলিয়ান আলভারেজকে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শুরু থেকেই আক্রমণভাগে লাওতারো মার্তিনেজকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে স্কালোনির প্রথম পছন্দ কে হবেন, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

কাতার বিশ্বকাপের শুরুতে আর্জেন্টিনার প্রধান স্ট্রাইকার ছিলেন লাওতারো মার্তিনেজ। তবে গ্রুপ পর্বে মেক্সিকোর বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ জয়ের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। সেই ম্যাচের পর থেকেই একাদশে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে ফেলেন হুলিয়ান আলভারেজ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক এই ফরোয়ার্ডকে।

আলভারেজের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর গতি এবং নিরলস প্রেসিং। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ কার্যকর। আধুনিক ফুটবলে একজন ফরোয়ার্ডের কাছ থেকে যে ধরনের পরিশ্রম ও তৎপরতা প্রত্যাশা করা হয়, আলভারেজ তা নিয়মিতভাবে করে দেখিয়েছেন।

বিশেষ করে লিওনেল মেসির সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছিল। মেসির কাছাকাছি থেকে খেলে সুযোগ তৈরি করা এবং দ্রুত ফিনিশিংয়ে দক্ষতা দেখিয়ে আলভারেজ কোচের আস্থা অর্জন করেন। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই বোঝাপড়া দলের জন্য বড় সম্পদ হয়ে ওঠে।

কাতার বিশ্বকাপে আলভারেজের অবদান ছিল অসাধারণ। পোল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করে দলকে জয় এনে দেন তিনি। এরপর শেষ ষোলোতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও গোল পান। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি নিজেকে দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

আরও পড়ুন  মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে গ্রেপ্তার অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন ক্রিকেটার ডেভিড ওয়ার্নার।

সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তাঁর জোড়া গোল এখনো আর্জেন্টিনা সমর্থকদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। সেই ম্যাচে তাঁর গতি, ফিনিশিং এবং আত্মবিশ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথে আলভারেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

অন্যদিকে লাওতারো মার্তিনেজও কখনোই আর্জেন্টিনা দলের পরিকল্পনার বাইরে ছিলেন না। বিশ্বকাপ জয়ের পর বিভিন্ন ম্যাচে তাঁকে পর্যাপ্ত সুযোগ দিয়েছেন স্কালোনি। এমনকি কিছু ম্যাচে আলভারেজ ও মার্তিনেজকে একসঙ্গে আক্রমণভাগে খেলিয়েছেন তিনি।

বিশেষ করে যখন মেসি দলের বাইরে ছিলেন, তখন দুই স্ট্রাইকারকে একসঙ্গে ব্যবহার করার কৌশল দেখা গেছে। এতে আর্জেন্টিনার আক্রমণে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছিল। তবে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে একজন কেন্দ্রীয় স্ট্রাইকারকেই বেছে নিয়েছেন স্কালোনি।

২০২৪ কোপা আমেরিকার পরিসংখ্যান মার্তিনেজের পক্ষে কথা বলে। পুরো টুর্নামেন্টে ৫ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন তিনি। মজার বিষয় হলো, আর্জেন্টিনার ছয় ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুটি ম্যাচে প্রথম একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন এই ফরোয়ার্ড।

পেরুর বিপক্ষে ম্যাচে স্কালোনি দ্বিতীয় সারির দল খেলিয়েছিলেন এবং সেখানে মার্তিনেজ একাদশে ছিলেন। পরে কোয়ার্টার ফাইনালে ইকুয়েডরের বিপক্ষেও সুযোগ পান তিনি। সীমিত সুযোগ পেয়েও নিজের গোল করার সামর্থ্যের প্রমাণ দেন ইন্টার মিলানের এই তারকা।

অন্যদিকে আলভারেজ তুলনামূলক বেশি সময় মাঠে ছিলেন। কানাডার বিপক্ষে দুটি গোল করে দলকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কোচের পরিকল্পনায় তিনি যে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছেন, সেটিরও প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর খেলার মিনিটে।

আরও পড়ুন  বিশ্বকাপে ইরানের বিপ্লব-পূর্ব পতাকা নিষিদ্ধে নতুন বিতর্ক

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের দ্বিতীয় ধাপে লিওনেল মেসির অনুপস্থিতি আর্জেন্টিনার কৌশলে কিছু পরিবর্তন আনে। মেসি চোটের কারণে একাধিক ম্যাচে খেলতে পারেননি। ফলে দলের আক্রমণ গঠনে মিডফিল্ডারদের দায়িত্বও বেড়ে যায়।

এই সময়ে লিয়ান্দ্রো পারেদেস মাঝমাঠে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন। পাশাপাশি থিয়াগো আলমাদা ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন। ফলে আক্রমণে সাধারণত একজন স্ট্রাইকারের জন্যই জায়গা তৈরি হয়।

সে জায়গায় বেশিরভাগ সময়ই খেলেছেন হুলিয়ান আলভারেজ। স্কালোনি তাঁর পরিশ্রম, গতিশীলতা এবং ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলার ওপর ভরসা রেখেছেন। এতে বোঝা যায়, কোচের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আলভারেজের গুরুত্ব কতটা।

মার্তিনেজের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চোট। পেশির সমস্যার কারণে তিনি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে উরুগুয়ে ও ব্রাজিলের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ম্যাচ খেলতে পারেননি। দলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুপস্থিত থাকাটা তাঁর জন্য অবশ্যই হতাশার বিষয়।

চিলি ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের জন্য দলে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ হয়নি মার্তিনেজের। শারীরিক অবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না থাকায় কোচিং স্টাফ তাঁকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাননি। ফলে প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়েও পড়েন তিনি।

চলতি বছরও প্রীতি ম্যাচগুলোতে মার্তিনেজকে পাওয়া যায়নি। একই চোটের কারণে ইন্টার মিলানের মৌসুমের শেষ অংশেও উল্লেখযোগ্য সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। তবু মাঠে নামলে তাঁর কার্যকারিতা ছিল প্রশংসনীয়।

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪১ ম্যাচে ২২ গোল করেছেন মার্তিনেজ। পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৬টি গোল। একজন স্ট্রাইকার হিসেবে এই পরিসংখ্যান তাঁর ধারাবাহিকতারই প্রমাণ দেয়।

অন্যদিকে ‘দ্য স্পাইডার’ খ্যাত হুলিয়ান আলভারেজও কাটিয়েছেন সফল মৌসুম। আতলেতিকো মাদ্রিদ বড় কোনো শিরোপা না জিতলেও দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।

আরও পড়ুন  ভিয়েতনামের কাছে হার, এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ নারী এশিয়ান কাপ থেকে বাংলাদেশের বিদায়

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৯ ম্যাচে ২০ গোল করেছেন আলভারেজ। পাশাপাশি ৯টি গোলে সহায়তা করেছেন। বিশেষ করে চ্যাম্পিয়নস লিগে তাঁর গোল করার দক্ষতা প্রশংসা কুড়িয়েছে ফুটবল বিশ্লেষকদের।

যদিও নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় গোলশূন্য ছিলেন তিনি। তবে সেই কঠিন সময় কাটিয়ে মৌসুমের শেষভাগে আবারও নিজের ছন্দ ফিরে পান। এতে তাঁর মানসিক দৃঢ়তারও পরিচয় পাওয়া যায়।

মৌসুমের শেষ দিকে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে বাঁ পায়ের গোড়ালিতে গুরুতর চোট পান আলভারেজ। তবুও ব্যথানাশক ওষুধের সাহায্যে ফিরতি লেগে খেলেন তিনি। পরে অবশ্য লা লিগার বাকি অংশ গ্যালারি থেকে দেখতে হয়েছে।

তবে বিশ্বকাপ সামনে রেখে আশার খবর হলো, আলভারেজ ইতোমধ্যে অনুশীলনে ফিরেছেন। সতীর্থদের সঙ্গে নিয়মিত প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তাই বিশ্বকাপের আগে তাঁর ফিটনেস নিয়ে বড় কোনো শঙ্কা নেই।

হন্ডুরাসের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে শারীরিকভাবে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকায় লাওতারো মার্তিনেজের শুরু করার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু সেটি বিশ্বকাপের মূল একাদশের চিত্র নির্ধারণ করে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

সবকিছু বিবেচনায় নিলে পুরোপুরি ফিট অবস্থায় স্কালোনির প্রথম পছন্দ হিসেবে এখনো হুলিয়ান আলভারেজ কিছুটা এগিয়ে আছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। তাঁর গতিশীলতা, প্রেসিং এবং মেসির সঙ্গে বোঝাপড়া তাঁকে বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে।

তবে লাওতারো মার্তিনেজও যে সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন, সেটি তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে। গোল করার দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা তাঁকে সমানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রেখেছে। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ৯ নম্বর জার্সিতে বিশ্বকাপের বড় ম্যাচগুলোতে কে শুরু করবেন, সেই উত্তর মিলবে সময়ের হাত ধরেই।