রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজে ক্যাম্পাস রাজনীতি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কলেজে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে মধ্যরাতে মূল ফটকের তালা ভেঙে একদল শিক্ষার্থী বিক্ষোভে অংশ নেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনার পর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে অভিযোগ করেন, ছাত্রীসংস্থার গুপ্ত কর্মীদের ইন্ধনে কলেজে মব সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদলের নেত্রী ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের হেনস্তা করা হচ্ছে।
গত শনিবার দিবাগত গভীর রাতে ইডেন মহিলা কলেজের মূল ফটকের সামনে কয়েকজন শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ক্যাম্পাসে সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় কলেজের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ মূল ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ ওঠে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়। যদিও এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর দেওয়া ফেসবুক পোস্টে নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ছাত্ররাজনীতিতে অংশ নেওয়া এবং রাজনৈতিক মত প্রকাশ করা একজন শিক্ষার্থীর সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। তিনি অভিযোগ করেন, একটি গুপ্ত সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মব তৈরি করে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতেও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, যারা সাধারণ শিক্ষার্থীর পরিচয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, পরবর্তীতে তাদের অনেকেই গোপন রাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
নাছির বলেন, ছাত্ররাজনীতিকে বিতর্কিত করতে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তার অভিযোগ, গুপ্ত সংগঠনের কর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি রাজধানীর তিতুমীর কলেজেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সেখানে রাতের বেলা গেট ভেঙে বিক্ষোভ করা হয় এবং ছাত্রদলের নেত্রীদের হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। তার দাবি, পরে ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া একজন শিক্ষার্থী শিবিরের কলেজ শাখার সেক্রেটারি হিসেবে পরিচিত হন।
ইডেন কলেজের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গেও তিনি সেই ঘটনার মিল খুঁজে পান। তার মতে, একই কৌশলে এখন ইডেন কলেজে মব সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রীসংস্থার গুপ্ত কর্মীরা শিক্ষার্থীদের উসকানি দিয়ে ক্যাম্পাসে অস্থির পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। নাছির উদ্দিন নাছির আরও দাবি করেন, ছাত্রদলের নেত্রীদের শুধু হেনস্তাই নয়, আবাসিক হল থেকেও বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু কাউকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বা সংগঠন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা গণতান্ত্রিক পরিবেশের পরিপন্থি। ক্যাম্পাসে সহনশীল পরিবেশ বজায় রাখতে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অবিলম্বে মব সন্ত্রাস ও ছাত্রদলের নেত্রীদের হয়রানি বন্ধ করা না হলে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। তার ভাষায়, কোনো গুপ্ত বাহিনীকে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে ইডেন মহিলা কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তারা চান, শিক্ষার পরিবেশ বজায় রেখে সব পক্ষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করুক। কিছু শিক্ষার্থী মনে করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মতবিরোধ রয়েছে। একপক্ষ ছাত্ররাজনীতিকে শিক্ষার্থীদের অধিকার হিসেবে দেখলেও অন্যপক্ষ ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ চায়। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রায়ই উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এসব উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
তারা মনে করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা বা মব সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ঘটনায় কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা এড়াতে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও ইডেন কলেজের ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, যেকোনো মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত। তারা চান না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংঘাত ও উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হোক। বরং নিরাপদ ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।




























